সার-ডিজেলে বাড়তি খরচ, ধানের লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

মাঠে মাঠে আমন ধান। কোথাও ধান পেকেছে, কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা। আর কিছুদিন পরই কৃষকের ঘরে উঠবে সোনালি ফসল। কিন্তু সেই ফসল ঘিরে এবার স্বস্তির চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি জামালপুরের কৃষকদের। জমি তৈরি, চারা রোপণ, সেচ, সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার ও পোকামাকড় দমনের প্রতিটি ধাপেই বেড়েছে আমন চাষের খরচ। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সার ও কীটনাশকের বাড়তি দাম এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরির চাপে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে সেচের বাড়তি খরচ এবং ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণ। অন্যদিকে ফসল ঘরে তোলার পর বাজারে কত দামে বিক্রি করতে পারবেন, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমন আবাদে খরচের চাপ বেড়েছে কয়েকটি কারণে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। এতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের খরচ বেড়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক জমিতে একাধিকবার সেচ দিতে হয়েছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশক ও কৃষিশ্রমিকের মজুরির বাড়তি ব্যয়ও যুক্ত হচ্ছে উৎপাদন খরচের সঙ্গে। কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করতে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যয় আরও বেশি হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, খরচ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে ধানের দাম বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। ফলে ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে তাদের। কৃষক ফরহাদ বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পর সেচের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি। জমিতে এত টাকা খরচ করে ধান ফলালেও বিক্রির সময় সেই টাকা উঠবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এত টাকা খেতে খরচ করলাম, সেই খরচের টাকাই এবার উঠবে না। ধান চাষ করে এবার লোকসান হবে। রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না।
খরচের চাপের পাশাপাশি ধানের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ নিয়েও উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। তারা জানান, সার ও কীটনাশকের দাম বেশি হওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে সার দেওয়া যায়নি। আবার কোথাও সময়মতো সারও পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে কারেন্ট পোকা ও মাজরা পোকার আক্রমণে ধানের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জামালপুর শহরের টিওবয়েল পাড় এলাকার কৃষক রানা বলেন, এবার আমন ধানের আবাদে খরচ অনেক বেশি। তেল-ডিজেলের দাম বেড়েছে, বিদ্যুতের খরচ আছে, সারের দামও বেশি। প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যায়নি। এর ওপর কারেন্ট পোকা ও মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে এবার ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি।
আরেক কৃষক সুলাইমান বলেন, ভালো বীজের চারা কেনা থেকেই খরচ শুরু। জমি চাষ করাতে ট্রাক্টর ভাড়া লাগে, সার-কীটনাশক কিনতে হয়, শ্রমিকের মজুরিও অনেক বেশি। আবার সেচ দেওয়া, ধান কাটা ও মাড়াই করতেও খরচের শেষ নেই। এত টাকা খরচ করে ধান ফলাই, কিন্তু বাজারে যদি ঠিকমতো দাম না পাই, তাহলে ধারদেনা করে চাষ করা কৃষকের পথে বসা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।
ধানের বাজারদর নিয়েও কৃষকদের উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় ধান ব্যবসায়ী জুয়েল বলেন, নতুন আমন ধান এখনও পুরোপুরি বাজারে আসেনি। অল্প পরিমাণে ধান আসছে বলে ব্যবসায়ীরা এখন বেশি কিনছেন না। বর্তমানে নতুন ধান এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকার মতো বিক্রি হচ্ছে। নতুন ধানে চালের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় দামও কম। অন্যদিকে, পুরোনো বিভিন্ন জাতের ধান এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। তবে নতুন ধানের সরবরাহ বাড়লে বাজারদর কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় এক লাখ ১৯ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২০০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে।
জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এবং উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কোনো কৃষক সমস্যার কথা জানালে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ফসলের পরিচর্যা ও চাষাবাদসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হবে।
ধানের উৎপাদন খরচ ও সরকারি ক্রয়মূল্য নিয়ে তিনি বলেন, সরকার এখনও আমন ধান কেনার দর নির্ধারণ করেনি। শিগগিরই খাদ্য অধিদপ্তর থেকে এ দর ঘোষণা করা হতে পারে। সরকারি ক্রয়মূল্য ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ধানের বাজারদর বা উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষকেরা কতটা দাম পাবেন, তা অনুমান করা যাচ্ছে না।
