logo

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল পরীক্ষামূলক চালু, অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট

লোকমান হাকিম
কক্সবাজার
কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল পরীক্ষামূলক চালু, অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট
সোমবার পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল এলাকার চিত্র। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সমুদ্র ও পর্যটননগরীর পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে এই টার্মিনাল দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের সেবা দেওয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও টার্মিনালটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হতে পারে। টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রীসেবা সক্ষমতা ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ২০ লাখে উন্নীত হবে। এতে কক্সবাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এর আগে, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিএ–১ শাখা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে ২৩ অক্টোবর ওই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।

নতুন টার্মিনাল চালুর প্রথম দিনে যাত্রীদের মধ্যে কৌতূহল ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। আধুনিক অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন তারা।

ঢাকা থেকে আসা যাত্রী আদিল হাসনাত বলেন, নতুন টার্মিনাল দিয়ে যাত্রা করতে পারব, বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো এবং আনন্দের। গতকাল রাতে হঠাৎ এসএমএস পেয়ে জানতে পারি, আমাদের নতুন টার্মিনাল দিয়েই যেতে হবে। অনেক বছর ধরে কক্সবাজারে আসি এবং টার্মিনালটির নির্মাণকাজ দেখেছি। কিন্তু কবে চালু হবে, তা নিশ্চিত ছিলাম না। আজ সকালে প্রথম দিকের ফ্লাইটে নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করতে পেরে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।

ক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে চেক-ইন কাউন্টারে বোর্ডিং পাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট
ক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে চেক-ইন কাউন্টারে বোর্ডিং পাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন যাত্রীরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

আরেক যাত্রী নাদিরা ইসলাম বলেন, নতুন হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনালটি বেশ সুন্দর। অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হয়রানিও কম। সহজেই লাগেজ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রে এমন পরিবেশ বহু আগে থেকেই প্রয়োজন ছিল।

যাত্রীদের জন্য যেসব সুবিধা

কক্সবাজার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল প্রকল্পের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মো. নুর নবী বলেন, আন্তর্জাতিক বহির্গমনের জন্য চারটি এবং আগমনের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রয়েছে। লাগেজ পরিবহনের জন্য রয়েছে দুটি বেল্ট। যাত্রীদের তথ্য দেওয়ার জন্য রয়েছে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ও ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। যাত্রীদের চলাচলের জন্য লিফট ও এসকেলেটর, চেক-ইন কাউন্টার, আলাদা আগমন ও বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং লাউঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য রয়েছে ডিউটি ফ্রি শপ ও বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধাও।

বেবিচক জানিয়েছে, নতুন টার্মিনালের সঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রোন। এতে একসঙ্গে দুটি ওয়াইডবডি ও তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ রাখা যাবে।

সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. সাইফুল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে বাংলাদেশের দুটি বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আনসারসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা। দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন বিমান ভ্রমণ নিশ্চিত করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

অক্টোবরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রস্তুতি

নতুন টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি দেখতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। সে সময় তিনি অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর আগামী অক্টোবর মাসে বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধনের পরিকল্পনার কথা জানান।

পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক গোলাম মোর্তোজা হোসেন নবনির্মিত টার্মিনাল ভবন থেকে সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিমানবন্দরের বিভিন্ন বিভাগ ও এয়ারলাইনসকে চিঠি দেন। এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রাকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।

বেবিচক জানিয়েছে, সমুদ্রের বুক থেকে জমি উদ্ধার করে বিদ্যমান রানওয়ের সঙ্গে নতুন অংশ যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে রানওয়ের মোট দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট সমুদ্রের ওপর ব্লক বসিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

বেবিচক জানায়, এই সম্প্রসারণের ফলে বড় আকারের ওয়াইডবডি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রানওয়ে ও এয়ারফিল্ড লাইটিং ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। সমুদ্রের ওপর নির্মিত অংশে প্রয়োজনীয় লাইটিং অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে।

রানওয়েটিকে ক্যাটাগরি-২ অপারেশনের উপযোগী করার কাজও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে বেবিচক।

কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর এম. মোশাররফ হোসেন বলেন, বিদ্যমান রানওয়ের ওপর অ্যাসফাল্টের ওভারলে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এক্সটেনশনসহ মোট ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের নির্মাণকাজও সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া রানওয়ে, লাইটিং ও সংশ্লিষ্ট সব কাজ শেষ হওয়ায় এটি এখন উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত।

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চীনের যৌথ প্রতিষ্ঠান সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি।

প্রসার ঘটবে ব্যবসা-বাণিজ্যে

কক্সবাজার বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রতিদিন ৫৪টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পর্যটনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে শুধু বিদেশি পর্যটকই আকৃষ্ট হবেন না, কক্সবাজারের অর্থনীতিতেও নতুন গতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে বিদেশে পাঠানো শুঁটকি, সবজি ও অন্যান্য পণ্য কক্সবাজার থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পাশাপাশি ট্রানজিট ও রিফুয়েলিং সুবিধা চালু করা গেলে রাজস্ব আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য দ্রুত কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কার্গো ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।