তীব্র গরমে মাদারীপুরে ভয়াবহ লোডশেডিং, ব্যাহত জনজীবন-শিক্ষা-ব্যবসা

তীব্র দাবদাহের মধ্যে অনিয়মিত ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মাদারীপুরের জনজীবন। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই এখন তীব্র বিদ্যুৎ সংকট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা। কোনো প্রকার নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন জেলাবাসী।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে পড়ার সময়ে বিদ্যুৎ না থাকায় আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাকফুট ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের।
ঝাউদি ইউনিয়নের মাদ্রা গ্রামের অনার্সের শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার ও রহিমা আক্তার জানান, গ্রামে দিন-রাতে মাত্র এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে, যা পড়ালেখার জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। একই সুর রাজারচর এলাকার আয়েশা, শীলা ও সাইফুলের— পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মাদ্রা উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজী ওবায়দুর রহমান জানান, ক্লাসে বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে, যা তাদের উপস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ডিজিটাল খাত। ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি হায়দার সরদার ও ছাপাখানার মালিক অলিউল আহসান কাজল জানান, কাজ শুরু করতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বুটিকস উদ্যোক্তা শিউলি আক্তার জানান, তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ জন নারী কাজ করেন। বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ বন্ধ রেখে কর্মীদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং কাজে নিয়োজিত শাহরিয়ার ও শুভ জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্লায়েন্টের কাজ সময়মতো জমা দেওয়া যাচ্ছে না, যা সরাসরি আয়ে আঘাত হানছে।
চার্জের অভাবে ঠিকমতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় নামাতে পারছেন না চালকেরা, যার ফলে কমছে তাদের দৈনিক আয়।
মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) অখিল সরকার এশিয়া পোস্টকে জানান, অসহ্য গরম ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে শিশুদের ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা বাড়ছে। পাশাপাশি প্রবীণদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১১ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য চাহিদা প্রায় ১০৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫২ মেগাওয়াট। ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে লোডশেডিং বণ্টন করা হচ্ছে।
তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আরেক হিসাবে, জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। ফলে দৈনিক গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, এপ্রিলের শুরু থেকেই তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে আগের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
.png)




