logo

খাল দখল করে তৈরি বিনোদন পার্ক পেল সরকারি পুরস্কার

শরীফুজ্জামান ফাহিম
সাভার, ঢাকা
খাল দখল করে তৈরি বিনোদন পার্ক পেল সরকারি পুরস্কার
ফ্যান্টাসি কিংডমের ফটক ও দখলকৃত জমির অংশ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরকারি তদন্তে সাভারের শতবর্ষী ‘নয়নজুলি খাল’ দখলের সত্যতা স্পষ্টভাবে উঠে আসার পরও অভিযুক্ত বিনোদন কেন্দ্র ফ্যান্টাসি কিংডম কমপ্লেক্সকে সরকারিভাবে বর্ষসেরা বিনোদন পার্কের পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনে কনকর্ড গ্রুপের মালিকানাধীন এই পার্কটিকে খালের অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদের সুপারিশ করা হলেও, সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ‘বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড’ তাদের হাতে এই স্বীকৃতি তুলে দেয়।

খাসজমি ও প্রাকৃতিক জলাশয় দখলকারী প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত করায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন আশুলিয়া ও জামগড়া এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।

তদন্ত প্রতিবেদনে দখলের চিত্র

সরকারি নথি থেকে জানা যায়, আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, দিয়াখালী মৌজায় অবস্থিত এসএ ১নং খতিয়ানের ৮৪নং দাগের (আরএস ৩৭৮, ৩৮২, ৩৮৩ ও বিআরএস ১০০৭০ নং দাগের অংশ) প্রায় ০.২৩ একর (২৩ শতাংশ) নয়নজুলি খালের উপরিভাগ ভরাট করেছে কনকর্ড গ্রুপের ফ্যান্টাসি কিংডম কর্তৃপক্ষ।

ভূমি কার্যালয়ের তালিকায় ফ্যান্টাসি কিংডমকে খালের অন্যতম প্রধান অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা ও ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কনকর্ড গ্রুপ উচ্ছেদ এড়াতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়ে পার্কের ভেতরের অংশ নিজ খরচে সংস্কার ও বক্স কালভার্ট নির্মাণের অনুমতি চায়।

জলাবদ্ধতা ও জনভোগান্তি

সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে খালের জমি একীভূত করে দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ বানানো হয়েছে। বর্তমানে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ রেখে কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমল থেকে আশুলিয়ার দিয়াখালী, জামগড়া ও বেরনসহ বিভিন্ন এলাকার পানি তুরাগ নদীতে নিষ্কাশনে মূল ভূমিকা পালন করতো এই নয়নজুলি খাল।

এমন বিতর্কের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ঘোষিত ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’-এর ১৬টি ক্যাটাগরির মধ্যে ‘বর্ষসেরা বিনোদন পার্ক’ হিসেবে ফ্যান্টাসি কিংডম কমপ্লেক্সকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে ঢাকার শের-ই-বাংলা নগরের বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

সরকারি এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে জামগড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, নয়নজুলি খালটি আমাদের এলাকার ফুসফুস ছিল। ফ্যান্টাসি কিংডম ব্যবসায়িক স্বার্থে মাটি ফেলে তা বন্ধ করে দিয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই আমরা পানিবন্দি হয়ে পড়ি। সরকার অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করে উল্টো তাদের হাতে সেরা বিনোদনের ট্রফি তুলে দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তিকে উপহাস করার সমান।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ বাকীর হোসেন মৃর্ধা বলেন, জলাশয় সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সরকারি খাল লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খালের মূল মুখ বন্ধ করে ২৩ শতাংশ সরকারি জমি দখল করায় ফ্যান্টাসি কিংডম নিশ্চিতভাবেই অবৈধ দখলদার। উচ্ছেদ না করে এমন প্রতিষ্ঠানকে সেরা বিনোদন কেন্দ্রের স্বীকৃতি দেওয়া চরম স্ববিরোধী ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

পুরস্কার প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উপ-পরিচালক (পরিসংখ্যান, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. মাজহারুল ইসলাম বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এশিয়া পোস্টকে জানান, এই পুরস্কার তো আমি দিইনি। এর জন্য উপযুক্ত কমিটি রয়েছে এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই সবকিছু করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত মহিবুল ইসলাম নামের উপ-পরিচালক বলতে পারবেন।

অন্য দিকে, বোর্ডের উপ-পরিচালক (বিপণন ও ব্র্যান্ডিং) মহিবুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, আসলে জাজ করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেসিস বা ফ্রেমওয়ার্ক থাকে। সেখানে ফাইন্যানশিয়াল, সোশ্যাল, লিগ্যাল ও কমপ্লায়েন্স-নন কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত নানা ক্রাইটেরিয়া বিবেচনা করে জুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফ্যান্টাসি কিংডম নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী আবেদন করেছিল। তবে খাস জমি বা খাল দখলের সুনির্দিষ্ট বিষয়ে রিভিউ প্যানেল বিস্তারিত বলতে পারবে। এখনই এ নিয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।

তবে খালের জমি উদ্ধারের আশ্বাস দিয়ে আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহিবুল্লাহ আকন এশিয়া পোস্টকে জানান, ফ্যান্টাসি কিংডমের ২৩ শতাংশ খালের ওপর স্থাপনা সরিয়ে উন্মুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধন কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে খালের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।