Advertisement

অফিস সহকারী থেকে পরীক্ষক, জয়ন্তের ‘প্রভাষক’ পরিচয় ঘিরে রহস্য

শুয়াইব হাসান, সিলেট
অফিস সহকারী থেকে পরীক্ষক, জয়ন্তের ‘প্রভাষক’ পরিচয় ঘিরে রহস্য
ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

সিলেট নগরের শিবগঞ্জ এলাকার গ্রিনহিল স্টেট কলেজের অফিস সহকারী জয়ন্ত দত্ত মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্রের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন। তাকে নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তে মিলেছে আরও তথ্য।

Advertisement

জয়ন্ত দত্ত নিজেকে প্রভাষক হিসেবে পরিচয় দিলেও তার কর্মস্থল গ্রিনহিল স্টেট কলেজের নথিতে ভিন্ন ভিন্ন পদে তার পরিচয় পাওয়া গেছে। কলেজের বিভিন্ন নথিতে তাকে কখনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কখনো হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং বোর্ডের কাছে প্রভাষক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো পদেই তার নিয়োগপত্র দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

সোমবার (১০ আগস্ট) তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে রেজিস্টারসহ বিভিন্ন নথি যাচাই করে এসব তথ্য পায়।

এক নথিতে তাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং অন্য নথিতে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ কলেজে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নামে কোনো পদই নেই। অন্যদিকে, শিক্ষা বোর্ডের কাছে তাকে প্রভাষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে এসব পদের কোনো একটিরও নিয়োগপত্র দেখাতে পারেননি জয়ন্ত দত্ত কিংবা কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, জয়ন্ত দত্ত আসলে কে এবং তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কোন পদে কর্মরত? কিসের ভিত্তিতে তিনি পাঁচ বছর ধরে এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে আসছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে কলেজের অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরে জয়ন্ত দত্তকে বরখাস্ত করার কথা জানিয়ে বোর্ডের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিতেশ রঞ্জন বর্মন।

গত বৃহস্পতিবার বোর্ডের চিঠির জবাব দিয়ে ক্ষমা চাইলেও তাতে সন্তুষ্ট হয়নি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। পরে ঘটনা তদন্তে বিদ্যালয় পরিদর্শক আবু মো. মূসা তারেকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. ফারুক আহমদ ও সহকারী মূল্যায়ন কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিব উল্লাহ বাহার।

সোমবার তদন্ত কমিটি গ্রিনহিল স্টেট কলেজে সরেজমিনে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এ সময় অভিযুক্ত জয়ন্ত দত্ত ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেন কমিটির সদস্যরা। নথিপত্র যাচাইয়ের সময় অনিয়মের আরও তথ্য উঠে আসে।

কমিটির প্রধান আবু মূসা মো. তারেক জানান, জয়ন্ত দত্তের বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। জয়ন্ত দত্ত ও কলেজের অধ্যক্ষ বোর্ডকে ভুল তথ্য দিয়েছেন। কলেজের নথিপত্রে জয়ন্তকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কোনো কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তিনি মূলত অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত। তবে বিভিন্ন রেজিস্টারে কোথাও তাকে হিসাবরক্ষক, আবার কোথাও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এসব পদের কোনো একটিরও নিয়োগপত্র পাওয়া যায়নি। অধ্যক্ষ কিংবা কলেজের চেয়ারম্যানও এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

তাহলে কীভাবে জয়ন্ত দত্ত প্রভাষক হিসেবে পরিচিত হলেন এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সুযোগ পেলেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালে পরীক্ষক নিয়োগে শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর জয়ন্ত অনলাইনে আবেদন করেন। ওই আবেদনের সময় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিতেশ রঞ্জন বর্মন তাকে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত থাকার একটি প্রত্যয়নপত্র দেন। জয়ন্ত ২০১২ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জয়ন্ত দত্তের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি শিক্ষক না হয়েও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা তার ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং এ জন্য ক্ষমা চান।

শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। সিলেট বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন কলেজের অধ্যক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও জয়ন্তকে প্রভাষক হিসেবে দেখানোর কারণ জানতে চান।

এরপর সিতেশ রঞ্জন বোর্ডে হাজির হয়ে জয়ন্তের নিয়োগপত্র দেখান। সেখানে প্রয়াত অধ্যক্ষ প্রশান্ত কুমার সাহার স্বাক্ষর ছিল বলে জানা যায়। তবে ওই স্বাক্ষর নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে বিষয়টি নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে অধ্যক্ষ বিষয়টি নিয়ে ক্ষমা চান এবং নিজের ভুল স্বীকার করেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন বলেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি করে দিয়েছি। কমিটির প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানা গেছে, জয়ন্ত দত্ত চলতি বছর পঞ্চমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তিনি বাংলা প্রথমপত্রের ৫৫৪ জন পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে শিক্ষা বোর্ডে জমা দিয়েছেন। অথচ পরীক্ষক হওয়ার জন্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হয়, তা তার নেই।

শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক যে বিষয়ে পাঠদান করেন, কেবল সেই বিষয়েই পরীক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষক হতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক।

২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রিনহিল স্টেট কলেজে ২০১১ সাল থেকে পাঠদান শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জয়ন্ত দত্ত সেখানে কর্মরত বলে জানা গেছে। তিনি এমসি কলেজ থেকে ২০০৮ সালে পাস কোর্সে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ২০১৯ সালে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তাকে প্রভাষক হিসেবে দেখিয়ে শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষক হিসেবে মনোনয়ন দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে তার পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জয়ন্ত দত্ত জানান, কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি সেখানে কর্মরত। ২০১৯ সালে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস করার পর শিক্ষক সংকট থাকায় তিনি বাংলা পড়ানো শুরু করেন। তবে শিক্ষক না হয়েও এইচএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা তার ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এ কাজের জন্য তার ন্যূনতম প্রশিক্ষণও ছিল না বলে জানান।

বিষয় :