logo
জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস

৫২ ধানের জাত নিয়ে রাইস গার্ডেন, পাল্টে গেছে দিনাজপুরের ‘প্রযুক্তিগ্রাম’

৫২ ধানের জাত নিয়ে রাইস গার্ডেন, পাল্টে গেছে দিনাজপুরের ‘প্রযুক্তিগ্রাম’
রাইস গার্ডেনে রোপন করা হয়েছে ৫২ জাতের ধান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আজ ২ অক্টোবর জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয়’। আর এই প্রতিপাদ্যকে সফল করতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কাজ করছে দিনাজপুরে। ব্রি এর উদ্যোগে সদর উপজেলার হুগলীপাড়া গ্রামের একটি মাঠে তৈরি করা হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘রাইস গার্ডেন’, যেখানে সারিবদ্ধভাবে আবাদ করা হয়েছে ৫২ জাতের ধান। উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও হাতে-কলমে আধুনিক প্রশিক্ষণের ফলে পুরো গ্রামটিই এখন কৃষকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘প্রযুক্তিগ্রাম’ হিসেবে।

দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই রাইস গার্ডেনে আমন ও বোরো উপযোগী উন্নত জাতের ধানের গাছ পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেতের সামনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে জাতের নাম ও বিস্তারিত গুণাবলি সংবলিত সাইনবোর্ড।

হুগলীপাড়া বা প্রযুক্তিগ্রামের অধিকাংশ কৃষকের জমিতে আবাদ করা হচ্ছে ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন জাতের ধান। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) হুগলীপাড়ায় এলএসটিডি প্রকল্পের অর্থায়নে ও উদ্যোগে চলতি আমন মৌসুমে দিনাজপুরে ব্রি উদ্ভাবিত মোট ৫২টি ধানের জাত নিয়ে এই রাইস গার্ডেন স্থাপন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের কাছে উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া, মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জাত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা তৈরি করা এবং কৃষকদের উন্নত ধান চাষে উৎসাহিত করা।

রাইস গার্ডেনে বোরো মৌসুম উপযোগী ব্রি উদ্ভাবিত ৫২টি ধানের জাত পাশাপাশি রোপণ করা হয়েছে, যাতে কৃষকরা সহজেই বিভিন্ন জাতের গাছের বৃদ্ধি, উচ্চতা, শীষের গঠন, রোগবালাই সহনশীলতা, ফলনক্ষমতা ও গুণগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় পরিবেশ উপযোগী উন্নত ধানের জাত নির্বাচন করা কৃষকদের জন্য সহজ হচ্ছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই হুগলী পাড়া গ্রামের অবস্থান। মহাসড়ক থেকে গ্রামটিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে দুই পাশে ধানের গাছ। প্রতিটি ধানের ক্ষেতে ধানের গাছের নামসহ বিবরণ দিয়ে সাইন দেওয়া রয়েছে। এই গ্রামে কৃষকদের জন্য ব্রি স্থাপন করেছে রাইস গার্ডেন। গার্ডেনটিতে দেশের ৫২টি জাতের ধানের চাষ করা হয়েছে। আর এই ধানের চাষ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন কৃষকরা। একই ক্ষেতে ৫২ জাতের ধানের চাষ দেখে খুশি কৃষকরা। পাশাপাশি নিজেদের জমিতে রোপণের জন্য ব্রি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তারা। ব্রি কর্তৃপক্ষও তাদের আগ্রহকে সাধুবাদ জানিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ব্রি সূত্রে জানা গেছে, ৫২টি জাতের মধ্যে রয়েছে বিআর-৩, বিআর-৪, বিআর-৫, বিআর-১০, বিআর-১১, বিআর-২২, বিআর-২৩, বিআর-২৫, ব্রি ধান-৩০, ব্রি ধান-৩১, ব্রি ধান-৩২, ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৩৭, ব্রি ধান-৩৮, ব্রি ধান-৩৯, ব্রি ধান-৪০, ব্রি ধান-৪১, ব্রি ধান-৪৪, ব্রি ধান-৪৬, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৫১, ব্রি ধান-৫২, ব্রি ধান-৫৩, ব্রি ধান-৫৪, ব্রি ধান-৫৬, ব্রি ধান-৫৭, ব্রি ধান-৬২, ব্রি ধান-৬৬, ব্রি ধান-৭০, ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭২, ব্রি ধান-৭৩, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৭৬, ব্রি ধান-৭৭, ব্রি ধান-৭৮, ব্রি ধান-৭৯, ব্রি ধান-৮০, ব্রি ধান-৮৭, ব্রি ধান-৯০, ব্রি ধান-৯১, ব্রি ধান-৯৩, ব্রি ধান-৯৪, ব্রি ধান-৯৫, ব্রি ধান-১০৩, ব্রি ধান-১০৯, ব্রি ধান-১১০, ব্রি ধান-১১১, ব্রি ধান-১১২, ব্রি হাইব্রিড ধান-৪ ও ব্রি হাইব্রিড ধান-৬।

হুগলীপাড়ার তরুণ কৃষক রাকিব বাবু বলেন, ‘আমরা আগে বাংলাদেশে কোন জাতের ধান হয়, সে বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। কীভাবে হয়, কোন ধান কত দিনে হয়। কিন্তু আমাদের এলাকায় এখন সবকিছু বাস্তবে ধারণা নিতে পারছি। পরবর্তী বছরে নিজের জমিতে কী ধরনের ধান চাষ করব, তা এই ক্ষেত থেকে জানতে পারছি।’

কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ব্রির মাঠ দেখে অনেকে আগ্রহী হচ্ছে। যেটা ধান ভালো ফলন হবে, সেটাই আমরা করব। এখনও ধানের শীষ বের হয়নি। তবে ধানের গাছ দেখেই অনেক কিছু বোঝা যায়। একসঙ্গে ৫২ জাতের ধান লাগানো হয়েছে মাঠে। যেটা ধান ভালো হবে, সেটাই আগামীতে আবাদ করব।’

কৃষক আবু সাঈদ বলেন, ‘ব্রি আমাকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। ব্রি আমাকে ধানের বীজ, সারসহ সব ধরনের সহযোগিতা করছে। আমি এবার জিরা ৩৪, কাঠারী এবং জিরা ৯০ আবাদ করেছি। সামনে ব্রির যেকোনো একটি জাতের ধান আবাদ করব।’

ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, দিনাজপুরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ জাহিদ হাসান বলেন, ‘ধান উৎপাদনে উৎপাদনশীলতা কেবল ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। মাঠপর্যায়ে অল্প জমিতেই পরিমিত পরিমাণ পানি ব্যবহার করে সঠিক মানের বীজ ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখাই আসলে উৎপাদনশীলতা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ১৫টি প্রযুক্তিগ্রামের কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়ন করে কীভাবে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যায়, সেটিও এই প্রকল্পের অন্যতম একটি লক্ষ্য। এই প্রকল্পের আওতায় ব্রি উদ্ভাবিত বিভিন্ন ধানের জাত কৃষকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষকরা সরাসরি জানতে পারছেন এবং তাদের দক্ষতার উন্নয়ন হচ্ছে।’

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের ১৫টি গ্রামকে প্রযুক্তিগ্রামে মডেল গ্রাম হিসেবে রূপান্তরে আমরা কাজ করছি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেভাবে আমরা স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন করছি, অন্যদিকে স্থানভিত্তিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের আওতায় ব্রি-১১৬, ১১৭ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ আমরা অবমুক্ত করেছি। ব্রি হাইব্রিড ধান-১০ এবং ব্রি-১১৭ ধান লবণাক্ততাসহিষ্ণু। পাশাপাশি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ব্রি-১১৮ নামে একটি জাতের ধান অবমুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে বন্যায় প্রতিবছর হাওর অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই জাতটি আমরা হাওর অঞ্চলে জনপ্রিয় করতে কাজ করছি। এই জাতটি আগাম রোপণ এবং আগাম কর্তন করা যাবে। এই প্রকল্পের আওতায় আমরা বেশ কিছু কৃষি উদ্ভাবন করেছি। পাশাপাশি আমরা আরও অনেক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছি।’