logo

ইউএনওর হস্তক্ষেপে অবশেষে ঘরে ফিরলেন সেই বৃদ্ধ মা

ইউএনওর হস্তক্ষেপে অবশেষে ঘরে ফিরলেন সেই বৃদ্ধ মা
বৃদ্ধ জয়নবের বাড়িতে গিয়ে পারিবারিকভাব বিষয়টির সমাধান করেন শাহরাস্তি ইউএনও মনিরা খাতুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অবশেষে এক ছেলের ঘরে ঠাঁই হয়ছে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানুর। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুনের হস্তক্ষেপে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টির সমাধান হয়।

এর আগে প্রতিষ্ঠিত পাঁচ ছেলে ও তাদের পরিবার থাকা সত্ত্বেও বার্ধক্যে এসে গ্রামের বাড়িতে ঘরে আশ্রয় পাননি ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু, এমন অভিযোগ উঠেছিল।

এ নিয়ে গতকাল সোমবার (১৯ অক্টোবর) ‘প্রবাসী ছেলেদের কারও ঘরে ঠাঁই পাননি ৮৫ বছরের জয়নব ভানু’ শিরোনামে অনলাইন নিউজপোর্টাল এশিয়া পোস্টে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর উপজেলা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি জানার পর বৃদ্ধ মা জয়নব ভানুকে ঘরে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, খাওয়া-দাওয়াসহ সবকিছু নিয়ে তার ছেলেরা কর্তব্য ও দায়িত্ব পালিন করবে, সে ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের এক ছেলের বাসার একটি রুম বৃদ্ধ মায়ের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

বৃদ্ধ জনয়ব ভানুর বিষয়টি পর্যবেক্ষণে থাকবে জানিয়ে ইউএনও মনিরা খাতুন বলেন, ছেলে ও ছেলেদের স্ত্রীদের বলে দিয়েছি, আমরা উপজেলা প্রশাসন তার বিষয়ে মনিটরিং করব, যেন কোনোভাবেই এই বৃদ্ধ মা আশ্রয়হীন ও অবহেলার শিকার না হন।

জয়নব ভানু শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের মৃত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। তার অভিযোগ, পাঁচ ছেলে থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময়ে এসে তাদের কারও ঘরেই তার ঠাঁই হয়নি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধার এমন অসহায়ত্বের চিত্র স্থানীয়দের ব্যথিত করেছে।

কী ঘটেছিল জয়নবের সঙ্গে

জয়নব ভানুর ভাষ্য, দীর্ঘ এক মাস কুমিল্লায় চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে তিনি ছেলেদের ঘরে আশ্রয় পাননি। একের পর এক দরজায় টোকা দিয়ে ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে দরজার সামনে বসে থাকেন তিনি। অসুস্থ শরীর, বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া ও অনিশ্চিত আশ্রয়—সব মিলিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন।

সোমবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সন্তানদের ঘরের সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করি। বউদের ডাকি। তারা বলে, এতদিন যার কাছে ছিলেন, এখন তার কাছে যান। আমার ছেলে আনোয়ার, ইমান, বড় ছেলে বউ। এতদিন কুমিল্লায় এক ছেলের বাসায় ছিলাম। এখন আমি মাঠে মাঠে ঘুরি।’

এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে দেখতে পেয়ে খোঁজখবর নেন। তাদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আকুতি জানান জয়নব ভানু। তার এই আকুতি স্থানীয়দের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি করে।

এদিকে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন সরেজমিনে গিয়ে সবার বক্তব্য শোনেন। তার হস্তক্ষেপে শেষে জয়নব ভানু ঘরে ফেরেন।

দুপক্ষের বক্তব্য শুনে বৃদ্ধ জয়নবকে ঘরে তুলে দেন শাহরাস্তি ইউএনও। ছবি: এশিয়া পোস্ট
দুপক্ষের বক্তব্য শুনে বৃদ্ধ জয়নবকে ঘরে তুলে দেন শাহরাস্তি ইউএনও। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, জয়নব ভানুর এক ছেলের পরিবার কুমিল্লায় বসবাস করে। সেখানে দীর্ঘ এক মাস থেকে চিকিৎসাসেবা নেন। পরে গত পরশু বাড়ি ফিরলে বাড়িতে থাকা অন্য ছেলেদের ঘরে ঠাঁই না পেয়ে দরজার সামনে অপেক্ষা করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বাদানুবাদ হলে একপর্যায়ে স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার জন্য গ্রামবাসীকে আকুতি জানান তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পাশের গ্রামে বিয়ে দেওয়া তার মেয়ে ঝরনা বেগম এসে মাকে নিজের কাছে নিয়ে যান।

মাসুদুল নামের গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, তার প্রবাসী ছেলে মনির হোসেন কয়েক দিন বাড়িতে ছিলেন। তখন তার মা তার সঙ্গে ছিল। তিনি যাওয়ার সময় আরেক ছেলে আনিসের কুমিল্লার বাসায় রেখে গেছেন। সেখান থেকে চিকিৎসা শেষে আসার পর মেজো ছেলে কাশেম তার ঘরে যাওয়ার জন্য কয়েকবার বলেছেন, উনি যান নাই। তবে পরিবারে কিছু সমস্যা আছে অনেক দিন ধরে। কিন্তু এখানে সবাইকে সমানভাবে দোষারোপ করা ঠিক না।

যা বলছেন পরিবারের সদস্যরা

এর আগে জয়নব ভানুর অভিযোগের বিষয়ে ছেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করে বলেন, তার মা দীর্ঘ এক বছর কোথায় ছিলেন, তা তারা জানেন না। তবে মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলে জানান তিনি।

বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, জয়নব ভানু তাদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসে ছিলেন। এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না।

সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রীও দাবি করে বলেন, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

মায়ের এমন অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝরনা বেগম। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার মা কুমিল্লা থেকে আসার পর এ অবস্থা শুনে আমি আসছি। প্রায় ২০ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করতেছে। তারা আমার মাকে খাওয়াতে চায় না, যত্ন নিতে চায় কারণ তারা মনে করে এসব করলেই আমি আমার মাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব। শেষে মাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান ঝরনা বেগম।

বয়সের শেষ প্রান্তে এসে একজন মায়ের এমন অসহায়ত্বের ঘটনা সমাজের পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সমাজে। তবে শাহরাস্তি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে জয়নব ভানুর আশ্রয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় তার জীবনের নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

এ বিষয়ে গ্রামবাসী বলছেন, একজন বৃদ্ধা মায়ের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত চিকিৎসা, খাবার এবং প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যৎ জীবন যেন অনিশ্চয়তা ও অবহেলায় না কাটে, সে জন্য উপজেলা প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। আমরা প্রশাসনের এমনস উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।