logo

সাভারের জলাশয়ে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি, দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা

সাভারের জলাশয়ে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি, দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা
শিল্পকারখানার বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণে বিপন্ন আশুলিয়ার নয়নজুলি খালের পরিবেশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন জলাশয়ে ‘পিএফএএস’ নামের দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক দূষণের উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (এসডো) পরিচালিত এক গবেষণায় আশুলিয়ার নয়নজুলি খাল ও সংলগ্ন লেকের পানিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি মাত্রায় এ রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

পিএফএএসকে ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বা দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক বলা হয়। কার্বন ও ফ্লোরিনের শক্তিশালী বন্ধনের কারণে এসব রাসায়নিক পরিবেশে সহজে ভাঙে না। ফলে পানি, মাটি ও খাদ্যশৃঙ্খলে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো জমতে পারে। কিছু পিএফএএস যৌগের সঙ্গে প্রজনন সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এসডোর গবেষণা অনুযায়ী, দূষণ শুধু নয়নজুলি খালেই সীমাবদ্ধ নয়। আশুলিয়ার বিভিন্ন জলাশয়, বংশাই, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদী এবং সাভারের পানপাড়াসহ আশপাশের এলাকাও এ দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এ দূষণের সম্ভাব্য উৎসের মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও পোশাকশিল্প এবং ভারী শিল্পকারখানা। সাভারের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ডিইপিজেড) ও এর আশপাশের শিল্পকারখানার আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিম এলাকার পানিতে পিএফএএসের মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে এসডো। এসব শিল্পকারখানার মধ্যে বস্ত্র, চামড়া, রাসায়নিক ও ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ট্যানারি শিল্প থেকেও এ ধরনের দূষণ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।

বিভিন্ন শিল্পে কাপড়ের রং, পানি ও তেল প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য তৈরি এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ায় পিএফএএস-জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহৃত হতে পারে। তবে কোন কারখানা থেকে কী পরিমাণ রাসায়নিক জলাশয়ে ছড়িয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা ও তদন্ত প্রয়োজন।

এসডোর গবেষণায় পানির নমুনা পরীক্ষা করে ৫৫টি পিএফএএস যৌগের উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পিএফবিএ, পিএফপিইএ, পিএফএইচএক্সএ, পিএফওএ, পিএফওএস এবং বিভিন্ন ফ্লুরোটেলোমার অ্যাসিড। গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পিএফওএ ও পিএফওএসের মতো কিছু যৌগ আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত। এসব রাসায়নিকের উপস্থিতি শীতের জ্যাকেট, ট্রাউজার ও হিজাবের মতো বাজারে বিক্রি হওয়া পোশাকেও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কিছু পিএফএএসের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে মানুষের প্রজননক্ষমতা ও ভ্রূণের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব রাসায়নিকের সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তন, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং টিকার কার্যকারিতা হ্রাসের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। কিছু পিএফএএসের সংস্পর্শে কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলজ প্রাণী ও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমেও এসব রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পিএফএএস সহজে ভেঙে না যাওয়ায় পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। তাপ, সূর্যের আলো কিংবা সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়ায় এসব যৌগ সহজে নষ্ট হয় না। ফলে দূষিত পানি ও মাটির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনে ফেলা হচ্ছে শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য। ছবি : এশিয়া পোস্ট
অপরিকল্পিতভাবে ড্রেনে ফেলা হচ্ছে শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য। ছবি : এশিয়া পোস্ট

নয়নজুলি খাল ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা জানান, দূষিত পানি ও ড্রেনের দুর্গন্ধে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, পানির দুর্গন্ধের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ চর্মরোগ, কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগার কথা জানিয়েছেন। তবে এসব অসুস্থতার সঙ্গে পানি বা পিএফএএস দূষণের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত করতে চিকিৎসা ও পরিবেশগত পরীক্ষা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা নিলুফা বেগম বলেন, আমাদের অনেক সমস্যা। ঘরের টিভি, ফ্রিজ ও আসবাবপত্রও ভালো থাকে না, নষ্ট হয়ে যায়। পচা ও দূষিত পানির গন্ধে ঘরে থাকা কঠিন। সোনা-রুপার গয়না পরলেও কালো হয়ে যায়। পানি ব্যবহার করতে পারি না, পানও করতে পারি না। একটি কোম্পানি থেকে পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে, তারপরও আমরা খুব অসুবিধায় আছি।

আরেক বাসিন্দা তাপসী সরকার বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই পানি আমাদের অনেক ক্ষতি করছে। আমার বড় ছেলে অসুস্থ, আমিও অসুস্থ। কাশি ভালো হয় না, চুলকানিও আছে। আবার ঠান্ডা-জ্বরও হচ্ছে। আগে এখানে এমন পরিস্থিতি ছিল না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি পোশাক কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, কাপড়ের রং ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। তার ভাষ্য, পরিবেশগত নিয়ম ও মানদণ্ড মেনে এসব রাসায়নিক ব্যবহার করা হলেও অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক বর্জ্য খোলা জলাশয় বা ড্রেনে ফেলা হলে তা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) প্রতিনিধি সাবিরু রহমান সেতু বলেন, আমরা এ এলাকার মাটি ও পানির নমুনা পরীক্ষা করেছি। এতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ধাতব পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগের কথা জানা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে কিডনির রোগসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। দূষণের কারণে পানি ও বাতাসের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

এসডোর আরেক প্রতিনিধি রিফায়াত খান শিশির বলেন, এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নয়নজুলি খাল থেকে পানি ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের দুটি স্বনামধন্য পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি। পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পানিতে বিভিন্ন ভারী ধাতুর পাশাপাশি পিএফএএস পাওয়া গেছে। গবেষকেরা এসব রাসায়নিককে ‘ফরএভার কেমিক্যালস’ বলেন। এগুলোর স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া আর্সেনিক, সিসা, পারদসহ অন্যান্য ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল আলম বলেন, পিএফএএস নামের একটি রাসায়নিকের বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিভিন্ন কারখানা অপরিশোধিত অবস্থায় এ রাসায়নিক ড্রেন, নালা বা অন্য কোথাও ফেলছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সুনির্দিষ্টভাবে কারা এবং কোথায় এসব রাসায়নিক ফেলছে, সে বিষয়ে তথ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে। যৌথ দল পাঠিয়ে বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপপরিচালক ইলিয়াস মাহমুদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আসিফ আল আজাদ

সম্পাদনা

আসিফ আল আজাদ

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট