logo

ভোলায় নিম্নচাপে উত্তাল নদী-সাগর, মাছ না ধরেই ঘাটে ফিরছেন জেলেরা

ভোলায় নিম্নচাপে উত্তাল নদী-সাগর, মাছ না ধরেই ঘাটে ফিরছেন জেলেরা
সাগরে গভীর নিম্নচাপের প্রভাব ভোলার মেঘনা ও উপকূলীয় নদীতে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদী ও উপকূলীয় সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে চলছে থেমে থেমে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া। বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে টিকে থাকতে না পেরে শত শত ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ঘাটে ফিরেছে। মাছ ধরতে না পেরে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভোলার বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই আকাশ ছিল মেঘলা। কখনো ভারী, আবার কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চরফ্যাশনের সামরাজ, পাঁচকপাট, চেয়ারম্যানঘাট ও দৌলতখানের চকিঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে শত শত মাছ ধরার ট্রলার আশ্রয় নিয়েছে।

জেলেরা জানান, মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের টানা নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে শেষবারের মতো সাগরে গিয়ে ভালো পরিমাণ মাছ ধরার আশা ছিল তাদের। সেই আশায় অনেক ট্রলারমালিক ও আড়তদার লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে জেলেদের সাগরে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাগরে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাওয়ায় জাল গোটায়ে খালি হাতেই তীরে ফিরতে হয়েছে।

চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে ফিরে আসা জেলে ইকবাল ও জুনায়েদ জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে তারা সাগরে যান। প্রথম দুই-তিন দিন কিছু মাছ পেলেও পরে আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে। বুধবার সকাল থেকে বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেলে সাগরে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে দ্রুত জাল গুটিয়ে তারা ঘাটে ফিরে আসেন।

তারা আক্ষেপ করে বলেন, অনেক আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে ঠিকমতো জাল ফেলতে পারিনি। বেশির ভাগ ট্রলারই খালি হাতে ফিরেছে। শেষ ট্রিপে মাছ না পাওয়ায় এখন বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে।

সামরাজ মৎস্যঘাটের ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ ট্রিপে ভালো ইলিশ পাওয়ার আশায় ট্রলারমালিক ও মহাজনেরা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় সেই আশা ভেস্তে গেছে। ঘাটে ফেরা শতাধিক ট্রলারের বেশিরভাগেই পর্যাপ্ত মাছ নেই। এতে জেলে ও ব্যবসায়ীদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।

সামরাজ মৎস্য মালিক সমিতির সভাপতি মো. আজিজ মেম্বার বলেন, এ বছর নদীতে এমনিতেই আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক ট্রলারমালিক ও আড়তদার আগে থেকেই লোকসানে ছিলেন। নিষেধাজ্ঞার আগের এই ট্রিপে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার আশা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে বড় ট্রলারগুলোর অধিকাংশই প্রায় শূন্য হাতে ফিরেছে।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে সাগরে ট্রলার বিকল হয়ে চার দিন ধরে ভেসে থাকা ১৮ জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সোনারচরসংলগ্ন সাগর থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার হওয়া ১৮ জেলেই ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের জোবায়ের এন্টারপ্রাইজের মৎস্য আড়তদার ফরহাদ হোসেন পাটোয়ারীর ট্রলারের জেলে।

উদ্ধারকারী ট্রলারে থাকা বিকল ট্রলিটির মালিক হানিফ মাঝির ভাই ফিরোজ রাঢ়ী জানান, তার ভাইসহ ১৮ জন মাঝিমাল্লাকেই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের চরফ্যাশনের হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের পাঁচকপাট স্লুইসগেট এলাকায় নিয়ে আসা হয়েছে।

তিনি জানান, গত শনিবার সাগরে মাছ ধরার পর রোববার ট্রলিটির পাখা ভেঙে যায়। এরপর সোনারচর ও রূপারচরের মাঝামাঝি এলাকায় ট্রলারটি নোঙর করে রাখা ছিল। তবে স্বজনদের অভিযোগ, উদ্ধারের জন্য কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তা চাওয়া হলেও ঘটনাস্থলে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ভারতের উত্তর অন্ধ্র প্রদেশ ও দক্ষিণ ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করেছে। বর্তমানে এটি স্থল গভীর নিম্নচাপ হিসেবে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে পারে।

নিম্নচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার আগে সাগরে ভালো মাছ পাওয়ার আশায় জেলেরা সাগরে গিয়েছিলেন। বর্তমানে নিম্নচাপের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় তাদের নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তারা আবার সাগরে যেতে পারবেন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরাও। রিকশাচালক আব্দুল গফুর বলেন, দুই দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারছি না। যাত্রী কম, ভাড়াও কম হচ্ছে। দিনে জমার টাকা আর সংসারের খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে জেলেদের ঘাটে ফিরতে হলেও, খালি হাতে ফেরায় তাদের মাথায় এখন বিরাট আর্থিক ক্ষতির চিন্তা। তবে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ভোলা-ঢাকা ও ভোলা-লক্ষ্মীপুর রুটে লঞ্চ ও ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।