৭ বছর বন্ধ আনারসের চিপস কারখানা, নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্র

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলাকে বলা হয় আনারসের রাজধানী। বছরজুড়েই এখানে প্রচুর আনারস চাষ হয়। তবে বাম্পার ফলন হলেও সঠিক বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে বাধ্য হয়ে কম দামে কিংবা পানির দামে আনারস বিক্রি করতে হয় চাষীদের। অথচ অচল হয়ে পড়ে আছে এ উপজেলাতেই তৈরি করা আনারসের চিপস কারখানা। নষ্ট হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।
পচনশীল এই ফল পচন থেকে রক্ষা করা, কৃষকদের আনারসের বিকল্প ব্যবহার শেখানো এবং বাণিজ্যিকভাবে আনারসের চিপস উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে একটি পরীক্ষামূলক প্রস্তুত ও প্রদর্শনী কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সে সময় কর্তৃপক্ষের বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে বুক বেঁধেছিলেন স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি চাষীরা।
তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটির দুয়ার। নির্মাণের ৭ বছর হতে চললেও কৃষি বিভাগের ফল প্রক্রিয়াজাত প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এই কারখানাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার অভাবে ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের সাড়ে তিন কোটি টাকার এই উদ্যোগ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুবিশাল এই স্থাপনাটি বর্তমানে পুরোপুরি তালাবদ্ধ। জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকালেই চোখে পড়ে ছোট-বড় বেশ কিছু দামি যন্ত্রপাতি। অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হতে বসেছে এসব যন্ত্র, খসে পড়ছে বৈদ্যুতিক তার। আর মেশিনের গায়ে জমে থাকা পুরু ধুলোর আস্তর জানান দিচ্ছে— বছরের পর বছর ধরে এটি একেবারেই অব্যবহৃত। এমনকি চাল ফুটো হয়ে ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়ছে। ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে গিয়ে ভবনটি এখন সারের বস্তা এবং ট্রাক্টর রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কারখানাটি বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নানিয়ারচর উপজেলার বগাছড়ি এলাকার আনারস চাষী মো. নুরুল আলম। তিনি বলেন, মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে বেপারীরা না আসলে পানির দামে আনারস বিক্রি করতে হয়। বিক্রি না হলে আনারস পচে নষ্ট হয়ে যায়। কারখানাটি তৈরির সময় ভেবেছিলাম আমাদের আর লোকসান গুনতে হবে না। কিন্তু প্রায় এক যুগ হতে চললো, এটি খোলাই হয় না। লোকসান ঠেকাতে সরকারের উচিত নানিয়ারচরের এই চিপস কারখানাটি দ্রুত চালু করা।
আরেক আনারস চাষি সুশান্ত চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, পাহাড়ে কষ্টের ফলের না পাই ন্যায্য দাম, না পাই সংরক্ষণের সুবিধা। কারখানা বানিয়ে তালা মেরে রাখা হয়েছে। এটি চালু থাকলে আমরা সরাসরি কারখানায় আনারস বিক্রি করে লাভের মুখ দেখতাম। কোটি টাকার যন্ত্র অচল হয়ে নষ্ট হচ্ছে, আর আমাদের কষ্ট আগের মতোই রয়ে গেছে।
নানিয়ারচর উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জোবায়দুল রহমান ভাসানী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি এখানে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এটি তালাবদ্ধ ছিল। ঠিক কী কারণে কারখানাটি এতদিন বন্ধ তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা নেই। তবে এটি পুনরায় চালুর বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনার অভাব থাকায় কারখানাটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি। কারখানা নির্মাণের সময়ে ভাবনায় বেশ ঘাটতি ছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত এটি রাষ্ট্রের টাকার অপচয়ে রূপ নিয়েছে। তবে নতুন করে সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া গেলে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার তৈরি এ কারখানার যন্ত্রপাতি এলাকার চাষীদের ভাগ্য বদলে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
