শিঙাড়া-পুরি বিক্রির টাকায় চলে প্রতিবন্ধী অর্নবের চিকিৎসা

সকাল হলেই চুলায় আগুন জ্বলে। গরম তেলে একের পর এক ভাজা হয় শিঙাড়া-পুরি। স্কুলের সামনে একটি ছোট্ট টোঙ দোকানে ক্রেতাদের কাছে এসব খাবার বিক্রি করেন অনিমেষ অধিকারী। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পাঁচ সদস্যের সংসার। সেই আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় শারীরিক প্রতিবন্ধী একমাত্র সন্তান অর্নবের চিকিৎসায়। কোনো দিন সংসারের বাজার হয়, কোনো দিন ছেলের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়। কখনো ধারদেনা করে চলে চিকিৎসা, কখনো অভাবের কারণে চুলায় হাঁড়ি ওঠে না। তবু ছেলেকে সুস্থ করে তোলার স্বপ্ন ছাড়তে পারেননি এই বাবা।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা অনিমেষ অধিকারীর ছেলে অর্নবের বয়স এখন ৯ বছর। জন্মের পর প্রথম দিকে সন্তানের শারীরিক সমস্যার বিষয়টি বুঝতে পারেননি মা-বাবা। দেড় বছর বয়সে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, অর্নবের পায়ে সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শে বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছেন তারা। ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু আট বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
অর্নব কোনো রকমে উঠে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে পড়ে যায়। পায়ের শিরার সমস্যার কারণে দুই পায়ে ভর দিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না সে। অথচ তার বয়সী অন্য শিশুরা যখন স্কুলে যায়, মাঠে খেলাধুলা করে, ছুটে বেড়ায়, তখন অর্নবকে কাটাতে হয় শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে।
পরিবারের ভাষ্য, চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে অর্নবের স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে তারা আশাবাদী। তবে এ জন্য প্রয়োজন তিন লাখ টাকার বেশি। দরিদ্র এই পরিবারের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অর্থের অভাবে আটকে আছে সন্তানের চিকিৎসার উদ্যোগ।
অর্নবের বাবা অনিমেষ অধিকারী শহরের সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণ হাইস্কুলের সামনে সড়কের পাশে একটি ছোট্ট টোঙ দোকান চালান। সেখানে নিজেই শিঙাড়া-পুরি তৈরি করেন, আবার নিজেই বিক্রি করেন। দিনভর পরিশ্রম করে যে সামান্য টাকা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ছেলের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হয় তাকে। চিকিৎসার খরচ বেড়ে গেলে সংসারের বাজার করার টাকাও থাকে না। তখন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়।
অনিমেষ অধিকারী বলেন, অর্নব আমার একমাত্র সন্তান। দেড় বছর বয়স থেকেই ওর পায়ের সমস্যা বুঝতে পারি। এরপর থেকে ধারদেনা করে অনেক চিকিৎসক দেখিয়েছি। এখন ওর বয়স ৯ বছর। ও নিজে উঠে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে যায়। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের কথা বলেছেন। কিন্তু এত টাকা কোথায় পাব?
কথা বলতে বলতে চোখ মুছতে থাকেন অনিমেষ। তিনি বলেন, নিজেরা যত কষ্টেই থাকি, ছেলেটা যদি সুস্থ হয়ে অন্য শিশুদের মতো হাঁটাচলা করতে পারত, তাহলে আমাদের আর কোনো দুঃখ থাকত না। সিঙ্গাড়া-পুরি বিক্রি করে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তার ওপর ছেলের চিকিৎসা। অনেক সময় ওর চিকিৎসার খরচ দিতে গিয়ে সংসারের বাজারও করতে পারি না। বাবা হয়ে টাকার অভাবে ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছি না, এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?
মা অনিমা অধিকারীর দিন কাটে ছেলেকে ঘিরে। সন্তানের কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। অর্নবের জন্মের পর থেকে তাকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে চান না তিনি। ছেলের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তার কাছে যেন একমাত্র সান্ত্বনা।
অনিমা অধিকারী বলেন, ছোট্ট দোকান থেকে যা আয় হয়েছে, তার বেশির ভাগই ছেলের চিকিৎসায় খরচ করেছি। অনেক দেনা হয়ে গেছে। তারপরও যদি ছেলেটা সুস্থ হয়ে অন্য শিশুদের মতো হাঁটতে পারত, তাহলে আমাদের চেয়ে সুখী আর কেউ হতো না। ছেলের মুখের দিকে তাকালে মা হয়ে কষ্টটা সহ্য করতে পারি না। আমাদের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়। তাই সামর্থ্যবান মানুষদের কাছে অনুরোধ, তারা যেন আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
প্রতিবেশী ঋষিকেশ সাহা জানান, অর্নবের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছে। অনিমেষের সামান্য আয়ের অধিকাংশই ছেলের চিকিৎসায় ব্যয় হয়। কোনো কোনো দিন চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে তাদের বাড়িতে রান্নাও হয় না। তিনি বলেন, পরিবারটি খুব কষ্ট করে। তারপরও ছেলেকে সুস্থ করার চেষ্টা থামায়নি। অর্নব যদি চিকিৎসা পেয়ে সুস্থভাবে হাঁটাচলা করতে পারে, তাহলে পরিবারটির দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা হলেও দূর হবে।
একদিকে সন্তানের চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে নিত্যদিনের সংসার চালানোর সংগ্রাম এই দুইয়ের টানাপোড়েনে অসহায় হয়ে পড়েছেন অনিমেষ ও অনিমা। তাদের সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু সন্তানকে ঘিরে স্বপ্নের সীমা নেই। অর্নবের ছোট্ট পায়ে একদিন ভর দিয়ে দাঁড়ানো, নিজের মতো করে হাঁটতে শেখা আর অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার দৃশ্য দেখতে চান তারা।
সেই স্বপ্ন পূরণে এখন প্রয়োজন মানুষের সহযোগিতা। তিন লাখ টাকার বেশি অর্থের সংস্থান করতে পারলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অর্নবের চিকিৎসার পথ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে পরিবারটি আশা করছে। তাই সন্তানের চিকিৎসার জন্য সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসা মানুষের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন তারা।



