logo

মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৪১২, নমুনা সংগ্রহ ৭২ জনের

খান মাহমুদ আল রাফি
মেহেরপুর
মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৪১২, নমুনা সংগ্রহ ৭২ জনের
অ্যানথ্রাক্সের প্রতীকী ছবি

এক বা দুই বছর নয়, এক দশকের বেশি সময় ধরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ চলছে মেহেরপুরের গাংনীতে। কখনো আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে, আবার কখনো তা বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৯৩ জন, পরের বছর ৬৮৬ জন।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল পর্যন্ত চলতি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১২ জনে। বছরের শেষ তিন মাস বাকি থাকতেই চার শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় রোগটির দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের ধরন, জীবাণুর বৈশিষ্ট্য ও দ্রুত শনাক্তের পদ্ধতি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। আক্রান্ত রোগীদের রক্ত ও ক্ষত থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৭২ জন রোগীর নমুনা সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ টিম। পাশাপাশি ২০০টি নমুনা সংগ্রহ করে অ্যানথ্রাক্স শনাক্তে র‍্যাপিড ডায়াগনস্টিক টুল (আরডিটি) নিয়ে একটি সার্ভেও চালানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনুসন্ধানের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশে বিদ্যমান তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্সের মধ্যে গাংনীতে কোন ধরনের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে, তা নির্ণয় করা। সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

আইইডিসিআরের টিমটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. আরিফ। তার সঙ্গে রয়েছেন টেকনিশিয়ান আব্দুল গাফফারসহ আরও দুই সদস্য। তবে গাংনীতে কাজ করা তিন সদস্যকে জরুরি ভিত্তিতে গাইবান্ধায় পাঠানো হয়েছে। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, সেখানে চার থেকে পাঁচ দিনের কাজ শেষ করে তাঁরা আবার মেহেরপুরে ফিরবেন।

তবে আইইডিসিআরের এই অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯৩ এবং ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত ছিলেন আরও ৬৩৭ জন।

অর্থাৎ বছরের পর বছর আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামা করলেও গাংনী থেকে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। বরং কয়েকটি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছয় থেকে সাত শ ছাড়িয়েছে। এবারও সেপ্টেম্বরেই আক্রান্তের সংখ্যা চার শতাধিক।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ রোগাক্রান্ত গরু-ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়ার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে গবাদিপশুতে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি, আক্রান্ত পশু জবাই এবং সেই পশুর মাংস বা দেহজাত পদার্থ মানুষের সংস্পর্শে আসার বিষয়টি সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।

মেহেরপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. ইনজামাম উল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, অ্যানথ্রাক্স মূলত তিন ধরনের হলেও মেহেরপুর জেলায় বর্তমানে শুধু কিউটেনিয়াস বা ত্বকের অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণই দেখা যাচ্ছে। এটি কিছুটা স্বস্তির বিষয়। নিকট অতীতে মেহেরপুরে আক্রান্ত রোগীদের কারও ফুসফুস বা অন্ত্রনালিতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।

তবে চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন তিনি। ডা. ইনজামাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাম্য চিকিৎসকেরা সাধারণ কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করছেন। এতে আক্রান্ত রোগীদের তথ্য জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। আবার কেউ কেউ আগে আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ওষুধের তথ্য অনুসরণ করে নিজেরাই চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তার ভাষায়, অ্যানথ্রাক্সের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা, সংক্রমণের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ওষুধ এবং মাত্রা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই অ্যানথ্রাক্সের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে পৌঁছানো জরুরি।

মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্স হয়ে থাকে। এর মধ্যে এ এলাকায় কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে। রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। সমন্বিত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি জানান, অ্যানথ্রাক্স নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গবাদিপশুর সংখ্যা ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০। এর মধ্যে গরু ৩ লাখ ৭৩ হাজার, মহিষ ১ হাজার ৪০০, ছাগল ৬ লাখ ৭১ হাজার এবং ভেড়া ২৯ হাজার।

এই বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে চলতি অর্থবছরে ২৪ হাজার ডোজ এবং গত অর্থবছরে ৭৮ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট জেলা হওয়ায় মেহেরপুরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টিকার বরাদ্দ তুলনামূলক কম। তবে গাংনীকে অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার পর গত বছর মেহেরপুর জেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ টিকার বরাদ্দ এসেছিল।

মেহেরপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানানো এবং আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ ও নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকতে গবাদিপশু পালনকারীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগ ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস নামের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এর জীবাণু স্পোর তৈরি করে, যা মাটি, পানি ও পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। দূষিত মাটি বা ঘাসের মাধ্যমে গবাদিপশু আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস, চামড়া, হাড় কিংবা অন্যান্য দেহজাত পদার্থের সংস্পর্শে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে আক্রান্ত পশু জবাই, মাংস কাটা, চামড়া ছাড়ানো বা মৃতদেহ নাড়াচাড়ার সময় ঝুঁকি বাড়ে।

মেহেরপুরে বর্তমানে যে কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে প্রথমে চুলকানি বা ছোট ক্ষত দেখা দিতে পারে। পরে ক্ষতস্থানে কালো অংশসহ ঘা এবং আশপাশে ফোলা হতে পারে। অন্যদিকে খাবারের মাধ্যমে অন্ত্রনালির এবং শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসীয় অ্যানথ্রাক্স হতে পারে, যা গুরুতর।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হঠাৎ মারা যাওয়া বা অ্যানথ্রাক্স সন্দেহযুক্ত পশু জবাই কিংবা খাওয়া যাবে না। মৃত পশুর চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটা বা দেহ খোলা থেকেও বিরত থাকতে হবে। মৃতদেহ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা বা কেটে টুকরা না করে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরাপদে নিষ্পত্তি করতে হবে। আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস, চামড়া বা অন্যান্য দেহজাত পদার্থ স্পর্শ করার প্রয়োজন হলে গ্লাভস, মাস্ক ও সুরক্ষাবস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি পরে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

অ্যানথ্রাক্স অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসাযোগ্য হলেও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত বা সন্দেহজনক পশুর সংস্পর্শের পর ত্বকে অস্বাভাবিক কালো ঘা, দ্রুত ফোলা, জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।