এআই ক্যামেরায় মিলছে হাতির আগাম তথ্য, কমছে সংঘাতের ঝুঁকি

শেরপুরে হাতি-মানুষের সংঘাত নতুন কিছু নয়। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যুগ যুগ ধরেই বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। খাবারের সন্ধানে প্রায়ই পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল। এতে ফসলের ক্ষতি ছাড়াও ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। তবে এই সংঘাত কমাতে এবার প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
হাতির চলাচলের পথে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা। এসব ক্যামেরায় হাতির উপস্থিতি শনাক্ত হলেই মুহূর্তের মধ্যে মোবাইলে চলে যাচ্ছে সতর্কবার্তা। আগাম খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাচ্ছেন বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। ফলে হাতি-মানুষের সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় প্রায়ই খাবারের সন্ধানে এক টিলা থেকে অন্য টিলায় চলাচল করে বন্যহাতির পাল। হাতির পাল যখন পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে, তখনই শুরু হয় সংঘাত। ফসল রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক সময় হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ সময় হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবার মানুষের সঙ্গে সংঘাতের কারণে আহত ও নিহত হয় বন্যহাতিও।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরীক্ষামূলকভাবে নালিতাবাড়ীর সমচূড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, ডালুকোণা ও দাওধারা-কাটাবাড়ীসহ হাতির চলাচলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ১৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স ও মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় এই পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এসব ক্যামেরা হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই ‘টেলিগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে এক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়। ফলে হাতি লোকালয়ে প্রবেশের আগেই বন বিভাগ ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারছেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করছেন।
স্থানীয়রা জানান, এসব ক্যামেরা লাগানোর ফলে আগে থেকেই জানা যাচ্ছে হাতি কখন লোকালয়ে নামছে। আগে হাতি লোকালয়ে না আসা পর্যন্ত কিছু বোঝার উপায় ছিল না। তবে এই ক্যামেরার সংখ্যা আরও বাড়ানো হলে তারা আরও বেশি উপকৃত হবেন।

সমচূড়া এলাকার বাসিন্দা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সভাপতি আরফান আলী বলেন, আগে হাতি আসার খবর পেতে অনেক দেরি হয়ে যেত। হঠাৎ হাতি সামনে চলে এলে সবাই আতঙ্কে পড়ে যেতাম। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে আগেই খবর পাওয়া যায়। বন বিভাগের লোকজনও দ্রুত চলে আসে। আমরাও স্থানীয়দের সচেতন করতে পারছি। এতে করে এই এলাকায় হাতির হামলা অনেকটাই কমেছে।
একই এলাকার বাসিন্দা আলমাছ মিয়া বলেন, হাতি এলে আমাদের ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। আবার হাতি তাড়াতে গিয়ে মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। আগে কখন হাতি আসবে, তা বোঝার উপায় ছিল না। এখন আগাম খবর পাওয়া গেলে আমরা নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারি। আমাদের এলাকায় আরও ক্যামেরা বসানো হলে ভালো হয়।
দাওধারা-কাটাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, হাতি আর মানুষের মধ্যে এমন যুদ্ধ আমরা আর চাই না। জন্মের পর থেকেই এই অবস্থা দেখে আসছি। আমরা চাই, হাতিও বাঁচুক, আমরাও নিরাপদে থাকি। বর্তমানে ক্যামেরা বসানোর পর কিছুটা সুবিধা হচ্ছে। তবে যেসব এলাকায় হাতির উপদ্রব বেশি, সেখানেও এই ব্যবস্থা করা দরকার।
মধুটিলা রেঞ্জের সমচূড়া বিট কর্মকর্তা কাওসার হোসেন বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা ক্যামেরাগুলোর মাধ্যমে হাতির চলাচল সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে এ এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা আগের চেয়ে কমেছে। হাতির প্রধান করিডোরগুলোতে এ ধরনের ক্যামেরা লাগানো গেলে খুব ভালো হতো। বিশেষ করে হাতিপ্রবণ এলাকাগুলোতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরী।
তিনি আরও জানান, নালিতাবাড়ীর বন্যহাতি উপদ্রুত এলাকায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বায়ো ফেন্সিং (কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদের বেড়া) নির্মাণ এবং ৫ হেক্টর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাঁশবাগান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে।
ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের কমিউনিটি গভর্নেন্স স্পেশালিস্ট আবরার আহমাদ বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ১৫টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করেছি, যা খুব সহজেই মুঠোফোনে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এর বড় সুবিধা হলো বন বিভাগের পাশাপাশি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরাও যুক্ত রয়েছেন। ফলে আগাম তথ্য পেয়ে হাতির কোনো ক্ষতি না করেই সেগুলোকে নিরাপদে পাহাড়ে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে কেবল ক্যামেরা স্থাপন করেই হাতি-মানুষের সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ের প্রভাষক হাবিবুল হক পলাশ বলেন, পাহাড়ে হাতির স্বাভাবিক বিচরণ ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। হাতির জন্য পর্যাপ্ত জলাশয় তৈরি এবং তাদের পছন্দের খাদ্যবৃক্ষের চারা রোপণ করা প্রয়োজন। তাহলে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমবে এবং এই পাইলট প্রকল্পও সফল হবে।
শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হলেও ইতোমধ্যে এলাকার মানুষ এর সুফল পেতে শুরু করেছে। এসব এলাকায় আরও এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম জলাশয় তৈরি এবং পাহাড়ে হাতির পছন্দের খাবার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে হাতির বিচরণক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে এই পাম্পগুলো স্থাপন করা হবে, যা নিরাপদ দূরত্ব থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে বন্যহাতি বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত পানি পাবে এবং পানির সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।


