logo

দুই মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন শূন্যরেখার সেই ষষ্ঠী চন্দ্র

শাওন মোল্লা
শাওন মোল্লা, জামালপুর
দুই মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন শূন্যরেখার সেই ষষ্ঠী চন্দ্র
সীমান্ত দিয়ে বৃদ্ধকে ঠেলে দেয় বিএসএফ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্তে দুই দেশের টানটান উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা সেই অসহায় বৃদ্ধের পরিচয় অবশেষে মিলেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ওই বৃদ্ধের নাম ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন বলে জানা গেছে। তিনি রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার মোহনপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁন্দলাই হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা।

ষষ্ঠী চন্দ্র দুই মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন বলে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এশিয়া পোস্টকে নিশ্চিত করেন তার ভাতিজা গোপাল চন্দ্র।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ওই বৃদ্ধকে উদ্ধার করে বিজিবি। পরে তাকে বকশীগঞ্জ থানা হেফাজতে নেওয়া হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন দুই মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন ষষ্ঠী চন্দ্র হয়তো আশপাশের কোনো গ্রামেই আছেন, তাই থানায় কোনো অভিযোগ বা জিডিও করা হয়নি।

সীমান্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা পরিবারের সদস্যদের নজরে আসে। পরে ভিডিও দেখে বৃদ্ধকে শনাক্ত করে তার পরিবার বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি তাকে উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করে।

শূন্যরেখা থেকে ওই বৃদ্ধকে উদ্ধার করে বকশিগঞ্জ থানা হেফাজতে রেখেছে বিজিবি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শূন্যরেখা থেকে ওই বৃদ্ধকে উদ্ধার করে বকশিগঞ্জ থানা হেফাজতে রেখেছে বিজিবি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এই দুই মাসে নিখোঁজ এই মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধ কীভাবে রাজশাহী থেকে শত মাইল দূরে ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকলেন, তা নিয়ে এখনো রহস্য রয়ে গেছে।

গত মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোররাতে বকশিগঞ্জের কামালপুর সীমান্ত দিয়ে বিএসএফ যে সাতজনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছিল, তাদেরই একজন ছিলেন এই ষষ্ঠী চন্দ্র। বিজিবি ও গ্রামবাসীদের তীব্র বাধার মুখে বাকিরা ভারতের দিকে পালিয়ে গেলেও এই বৃদ্ধ শূন্যরেখায় আটকা পড়েন। বুধবার (১০ জুন) দুই দেশের পতাকা বৈঠকেও কোনো সমাধান না হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে তাকে থাকতে হয়।

অবশেষে মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর উদ্ধার করে বকশীগঞ্জ থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বকশীগঞ্জ থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃদ্ধের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। বৃদ্ধ ষষ্ঠী চন্দ্র বর্মন এখন সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। তার পরিবারের লোকজন ইতোমধ্যেই রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তারা থানায় এসে পৌঁছালেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বৃদ্ধকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

রাজশাহীর ষষ্ঠী চন্দ্রের জাতীয় পরিচয়পত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রাজশাহীর ষষ্ঠী চন্দ্রের জাতীয় পরিচয়পত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ষষ্ঠী চন্দ্রের ভাতিজা গোপাল চন্দ্র বর্মন ফোনে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কাকা দুই মাস আগে হঠাৎ নিখোঁজ হন। আমরা দিনমজুর, মানুষের বাড়ি চেয়ে-চিন্তে খাই। তাই পুলিশ-থানা করতে পারিনি। দিন ১৫ আগে এক সাংবাদিকের মাধ্যমে কুড়িগ্রামে ওনার উপস্থিতির কথা জানলেও পরে আর খোঁজ পাইনি। হঠাৎ ফেসবুকে সীমান্তে আটকে থাকার ভিডিও দেখে আমরা ওনাকে চিনতে পেরে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার বাবা কাকাকে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যেই জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।’

গোদাগাড়ীর বাসিন্দা ইউসুফ হাসান জনি বলেন, ‘উনি তো আমার বাড়ির পাশেরই মানুষ। এই যে আছে না কেউ কামলা না দিয়া ঘরে ঘুমায়ে খাইতে পারলে যে রকম হয়। কামলা না দিয়া ধরেন বাসায় বইসা থাইকা খায়-দায়। হয়তো বউ-বাচ্চা তো একটু বলবেই, কারণ কাজকাম না করলে তো বউ-বাচ্চাও খাইতে পাবে না। তখন হয়তো রাগ করে বাসা থেকে চলে যেতে পারে। ওনার পরিবারে সবাই আছে- বউ, ছেলে, সন্তান সবই আছে।’

তিনি আরও বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পরপরই ষষ্ঠী চন্দ্র বাড়ির কাছেই (মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে) গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়ে ভারতে পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখন বিজিবি তাকে আটক করলেও তার আচরণ দেখে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবে গোদাগাড়ী চত্বরে এনে ছেড়ে দেয়। কিন্তু সেখান থেকেই মূলত তিনি পুরোপুরি নিখোঁজ হয়ে যান।

গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ আতিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি এই থানায় নতুন যোগদান করেছি। নিখোঁজের বিষয়ে আগে কোনো ডায়েরি বা অভিযোগ হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। তবে গতকাল আমরা বৃদ্ধের বিষয়ে তথ্য পেয়ে খোঁজখবর শুরু করি এবং তার স্থায়ী পরিচয় নিশ্চিত হতে সক্ষম হই।

বকশীগঞ্জ থানার ওসি মো. মকবুল হোসেন বলেন, বৃদ্ধকে থানায় আনা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।