logo

‘ভাইয়ের বাড়িও যদি ধরলার পেটোত যায়, যামো কোনঠে’

জুয়েল রানা
কুড়িগ্রাম
‘ভাইয়ের বাড়িও যদি ধরলার পেটোত যায়, যামো কোনঠে’
ধরলা নদীর তীব্র স্রোতে বিলীন হচ্ছে পাড়ের মাটি। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে নদীপাড়ের বসতবাড়ি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ধরলা নদীর ভাঙনোত স্বামীর ভিটেমাটি নাই। ভাইয়ের বাড়িত থাকি। ভাইয়ের বাড়িও ভাঙি গেইলে যামো কোনটে? তোমার গুল্যার কাছোত অনুরোধ, নদীটা হামার বান্দি দেও।

এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের জগমনের চরের বাসিন্দা মজিরন বেওয়া (৭০)। স্বামী-সন্তানহীন এই বৃদ্ধা বর্তমানে ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রিত।

মজিরন বেওয়া বলেন, আমার স্বামী-সন্তান নাই। ভাইয়ের বাড়িত আছি। এই বাড়িটাও যদি ধরলার পেটোত যায়, এই বয়সে আমি যামো কোনঠে?

জগমনের চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই ধরলা নদী তাদের স্বপ্ন, বসতভিটা ও ফসলি জমি গিলে খায়। এ বছর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম আলী বলেন, ধরলার ভাঙনে অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। এখন ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে এলাকার একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফ্রেন্ডশিপ স্কুল, একটি মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। স্কুলটি নদীগর্ভে বিলীন হলে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।

আরেক বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ধরলার ভাঙনে পুরো এলাকাটা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, কৃষক হারাচ্ছেন ফসলি জমি। আমরা সরকারের কাছে ত্রাণ চাই না, চাই নদী রক্ষা বাঁধ।

শুধু জগমনের চর নয়, নদ-নদীর পানি বাড়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায়ও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। রাজারহাট উপজেলার তিস্তা নদীর বুড়িরহাট, সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুধকুমার নদের অববাহিকার বানিয়াপাড়া এবং ভোগডাঙ্গার ধরলা নদীর অববাহিকার জগমনের চরসহ অসংখ্য এলাকার নদীতীরবর্তী মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের অববাহিকায় বর্তমানে প্রায় ৭২টি পয়েন্টে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে।

সূত্রটি আরও জানায়, জেলার নদ-নদীর দুই তীর মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৭০ কিলোমিটার স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হওয়ায় বাকি বিস্তীর্ণ জনপদ প্রতিবছর ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।