logo
Advertisement

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স/ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসাসেবা

এশিয়া পোস্ট নিউজ,বাগেরহাট
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে চিকিৎসাসেবা
কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, তীব্র চিকিৎসক সংকট এবং দীর্ঘদিন ধরে প্যাথলজি কার্যক্রম ও জটিল অস্ত্রোপচার বন্ধ—এমন নানা সমস্যায় জর্জরিত বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে থাকার বিষয়। অবকাঠামো ও জনবলসংকটে হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত রোগী এলেও প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে তাদের ছুটতে হচ্ছে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে। এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়, সময় ও ভোগান্তি বহুগুণ বাড়ছে।

Advertisement

সরেজমিনে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, গণপূর্ত বিভাগ ঘোষিত ৩১ শয্যার একটি পরিত্যক্ত ভবনেই চলছে জরুরি বিভাগ, স্বাস্থ্য সহকারীদের কার্যালয়, টিকাদান কার্যক্রম, সেবিকা কক্ষ এবং ভর্তি রোগীদের জন্য চারটি শয্যাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম। ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল এবং কোথাও কোথাও ছাদের রড বের হয়ে গেছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০০৫ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৩৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন, যার মধ্যে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন ১০ জন। ফলে চিকিৎসকের ২০টি পদই শূন্য। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় দীর্ঘ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে যে কোনো জটিল অস্ত্রোপচার। আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও বর্তমানে কেবল কাটা-ছেঁড়া বা ফোঁড়ার মতো ছোটখাটো চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে প্যাথলজিস্টের পদ থাকলেও টেকনোলজিস্ট না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে প্যাথলজি বিভাগের কার্যক্রম। ফলে সাধারণ রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

দুর্দশা রয়েছে এক্স-রে বিভাগেও। ১৯৭২ সালের পুরোনো প্রযুক্তির এক্স-রে মেশিন দিয়ে কোনোমতে কাজ চালানো হলেও প্রায় নয় মাস আগে আসা নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনটি বাক্সবন্দি পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ ও আলাদা কক্ষ না থাকায় এটি চালু করা যাচ্ছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনটি চালাতে প্রায় ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, অথচ পুরো হাসপাতাল চলছে মাত্র ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগে। মেশিন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কক্ষ ও বিদ্যুতের চাহিদার কথা জানিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে আধুনিক মেশিনটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৬৭টি অনুমোদিত পদের বাইরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ছয়জন কর্মরত রয়েছেন। তবে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবলসংকট থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

চিকিৎসা নিতে আসা নাজমুল আহমেদ বলেন, ডাক্তার কম থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও এখানে হয় না। ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ, পলেস্তারা খসে পড়ছে, ফাটল দেখা দিয়েছে। সবসময় ভয়ে থাকতে হয়। আমরা চাই সরকার দ্রুত ভবন সংস্কার করে পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স নিয়োগ দিক।

ভর্তি এক নারী রোগীর স্বজন মো. অয়ন বলেন, ভবন পরিত্যক্ত হওয়ায় নারী-পুরুষ সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হচ্ছে। শয্যাসংকটে বারান্দায় রাত কাটাতে হচ্ছে, যা নারীদের জন্য খুবই বিড়ম্বনার। ছাদে রড বের হয়ে আছে, পর্যাপ্ত ফ্যান ও বাথরুম নেই। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মল্লিক বলেন, উপজেলার মানুষের প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল। কিন্তু এখানে এসে সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বাগেরহাট শহর বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে টাকা ও সময় দুটোই নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান দরকার।

জীবনযাত্রার ঝুঁকির কথা জানিয়ে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক শেখ আসাদুজ্জামান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে বাইরে থাকছি। এখনো কিছু কর্মচারী সেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মুশফিকুর রহমান তরফদার বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পরিত্যক্ত ভবনে প্রতিদিন জরুরি, আন্তঃ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে ৩০০-এর বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। ফাটল ধরা ভবনে ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বাড়ে। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় বড় অস্ত্রোপচারও বন্ধ রাখা হয়েছে।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হাসান মাহমুদ জানান, বিদ্যুৎ ও কক্ষের সংকটে নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সমাধান আসবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং বন্ধ থাকা সব চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালু করা হোক; অন্যথায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা একেবারে হারিয়ে যাবে।