logo

পিরোজপুর/৮৭ পদের ৬২টিই শূন্য, ২৫ জনে চলছে প্রাণিসম্পদ সেবা

নাছরুল্লাহ আল-কাফী
পিরোজপুর
৮৭ পদের ৬২টিই শূন্য, ২৫ জনে চলছে প্রাণিসম্পদ সেবা
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

পিরোজপুরে তীব্র জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরসহ সাতটি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কার্যক্রম। জেলায় মোট ৮৭টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫ জন। শূন্য রয়েছে প্রায় ৬২টি পদ। এসব পদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশই শূন্য। মাত্র ২৮ শতাংশ জনবল দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকটের কারণে দাপ্তরিক কার্যক্রম ও প্রাণীর চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। ফলে খামারিরা বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে দুজন কর্মকর্তা ও পাঁচজন কর্মচারীসহ মোট সাতটি পদ শূন্য রয়েছে। মাত্র তিনজন জনবল দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

পিরোজপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে কর্মকর্তাসহ নয়টি পদই শূন্য। মাত্র দুজন কর্মচারী দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

জিয়ানগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আটটি পদই শূন্য। এখানে মাত্র তিনজন দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

নাজিরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ছয়জন দিয়ে চলছে কার্যক্রম। বাকি প্রায় পাঁচটি পদ শূন্য।

মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আটটি পদই শূন্য রয়েছে। মাত্র তিনজন দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

এ ছাড়া ভান্ডারিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১১টি পদের মধ্যে প্রায় নয়টি পদই শূন্য। মাত্র দুজন জনবল দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

কাউখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আটটি পদ শূন্য রয়েছে। এখানে মাত্র তিনজন জনবল দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

নেছারাবাদ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আটটি পদ শূন্য রয়েছে। এখানেও মাত্র তিনজন জনবল দিয়ে চলছে কার্যক্রম।

প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানায়, জেলায় গাভির খামার রয়েছে ৭৪২টি। হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার ২১৬টি, ছাগলের খামার ৩৩২টি, মহিষের খামার ২৭টি, লেয়ার মুরগির খামার ৯৯১টি, ব্রয়লার মুরগির খামার ৩১২টি, সোনালি মুরগির খামার ১৭২টি, হাঁসের খামার ১৩৪টি এবং কবুতরের খামার ৩৬টি।

এ ছাড়া জেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয়েছে ১ দশমিক ৬১ লাখ মেট্রিক টন, মাংস উৎপাদন হয়েছে ১ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম উৎপাদন হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৭ লাখ।

পিরোজপুর শহরের মন্ডলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহাবুব হোসেন বলেন, প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে সাধারণ মানুষ এসে নিয়মিত চিকিৎসক পাচ্ছেন না। এ কারণে আমরা সেবা পাচ্ছি না। এর মূল কারণ হচ্ছে, এই হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক নেই। জানতে পেরেছি, চিকিৎসকের পদ শূন্য। আমরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত মেধাবী চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে হাসপাতালের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হোক।

জিয়ানগর উপজেলার ইন্দুরকানী গ্রামের বাসিন্দা ও কলেজশিক্ষার্থী মো. সিহাব হাওলাদার বলেন, আমার পোষা বিড়ালটি অসুস্থ হওয়ায় এই প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। তবে এখানে একজন মাত্র ডাক্তার থাকায় তিনি উপজেলায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তাই প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এখানে অপেক্ষা করেছি। এখানে খুবই দুর্দশা। এই ভোগান্তি আমরা আর চাই না। আমাদের এলাকায় অনেক পশুপাখি রয়েছে। তাই আমাদের দাবি, হাসপাতালের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হোক এবং আমরা যেন ভালো সেবা পেতে পারি।

উপজেলার চাড়াখালী গ্রামের বাসিন্দা ও জিয়ানগর প্রেসক্লাবের সদস্য মো. আল আমিন বলেন, আমরা যতটুকু জানি, এই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জনশূন্য বললেই চলে। কারণ, এখানে অধিকাংশ জনবলই নেই। ১০-১১ জনের পরিবর্তে মাত্র দুই-তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে চলছে এখানকার কার্যক্রম, যা অপ্রতুল। আমাদের এলাকার মানুষ প্রচুর পরিমাণে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালনে ঝুঁকছে। সে ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল থাকলে সাধারণ কৃষকদের জন্য সুবিধা হতো। সরকারের কাছে আবেদন জানাই, এখানে যেন পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়। আমরা দেখতে পাই, এই দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে। এই ভারমুক্ত করে জনবল বৃদ্ধি করলে এলাকাবাসীর জন্য ভালো হবে। মাত্র একজন ডাক্তার দিয়ে এত বড় উপজেলার কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়।

লিটন হাওলাদার নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, এই পশু হাসপাতালে আমরা সঠিকভাবে সেবা পাচ্ছি না। কারণ, এখানে লোকসংখ্যা খুবই কম। সরকার যদি এখানে লোকসংখ্যা বাড়ায়, তাহলে আমরা ভালো সেবা পাব।

পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা এলাকার বাসিন্দা ও খামারি মো. জুলফিকার খান বলেন, আমার প্রায় ২০-২৫টি গরু রয়েছে। পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু অনেক সময় হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক বা জনবল পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়।

পিরোজপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ড্রেসার কার্তিক চন্দ্র হাওলাদার বলেন, আমাদের এখানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদসংখ্যা ১১টি। আমরা এখানে আছি মাত্র দুজন। আমাদের কাছে যারা সেবা নিতে আসেন, জনবল সংকটের কারণে তাদের সেবা দিতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। আমাদের ভবনের অবস্থাও খুব নাজুক। বৃষ্টি হলেই কক্ষের ভেতরে পানি পড়ে। ভবনটিও জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন। সরকারের কাছে আবেদন করি, যেন আমাদের এখানে জনবলের ঘাটতি পূরণ করা হয় এবং ভবনটিও মেরামত করা হয়।

মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহা. নুর আলম বলেন, এটি একটি বড় উপজেলা। এত বড় উপজেলায় অর্ধেকের কম জনবল নিয়ে সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। মাঠপর্যায়ে টিকা প্রদান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও উঠান বৈঠক কার্যক্রমে গতি আসছে না। মাঠপর্যায় থেকে চিকিৎসার জন্য যে খবরগুলো আসে, দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে এখানে কোনো ওষুধের সংকট নেই। তবুও আমরা নিয়মিত সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

জিয়ানগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে আছি। আমাদের এখানে রাজস্বের মোট ১১টি পদ আছে। এর মধ্যে আটটি পদই ফাঁকা রয়েছে। হেড অফিস থেকে রিপোর্ট চেয়েছিল, আমরা একাধিকবার রিপোর্ট পাঠিয়েছি; কিন্তু আশানুরূপ ফল পাইনি। আমাদের অফিসে দুজন ক্যাডার কর্মকর্তা থাকার কথা, কিন্তু আমি একাই আছি। একসঙ্গে ফিল্ড ও অফিস সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাজ হচ্ছে ফিল্ড লেভেলে বেশি। আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি, তবে কোয়ালিটিপূর্ণ যে সেবাটা দরকার, সেটা দিতে পারছি না। এ ছাড়া অফিসের সার্বিক কার্যক্রম চালাতেও আমাদের কষ্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের একটি প্রজেক্ট ছিল। সেই প্রজেক্টের চার-পাঁচজন লোক আমাদের এখানেও ছিলেন। তবে বর্তমানে প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় আছি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার সিকদার বলেন, আমাদের জেলা অফিসসহ সাতটি উপজেলায় ব্যাপক জনবল শূন্য রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জনবল সংকটের কারণে আমাদের বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। তারপরও আমাদের যে জনবল রয়েছে, তা দিয়ে মানুষকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া আমাদের দপ্তরের যে সংযোগ সড়ক আছে, সেটির অবস্থাও খুবই বেহাল এবং সদর প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভবনটিরও খুবই নাজুক অবস্থা। আশা করি, আমাদের এই জনবল সংকটসহ যেসব সমস্যা রয়েছে, তা দূর হলে অফিসগুলো স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।