logo

বাম্পার ফলনেও ধানের দাম কম, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম কৃষকের

বাম্পার ফলনেও ধানের দাম কম, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম কৃষকের
মৌসুমি ধান তোলার পর স্থানীয় বাজারে চলছে কেনাবেচা। ছবি: ডেইলি স্টার থেকে নেওয়া

মাঠজুড়ে সোনালি ধানের সমারোহ। কোথাও চলছে ধান কাটা, কোথাও মাড়াই। নতুন ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন রাজশাহীর কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার আউশের ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। তবে ভালো ফলনের পরও কৃষকের মুখে হাসি নেই। কারণ, বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

কৃষকদের দাবি, আউশ চাষে বীজ, জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, ধান কাটা ও মাড়াইসহ প্রায় সব খাতেই বেড়েছে উৎপাদন খরচ। এর বিপরীতে মৌসুমের এ সময়ে বাজারে প্রতি মণ আউশ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। ফলে ভালো ফলন পেয়েও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।

রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী, তানোর, মোহনপুর, পুঠিয়া ও বাগমারার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমির ধরন ও সেচের প্রয়োজন অনুযায়ী এক বিঘা জমিতে আউশ চাষে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ খরচ আরও বেশি। বিপরীতে এক বিঘা জমিতে গড়ে ১২ থেকে ১৬ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে।

বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ১২ মণ ধান হলে ৬৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে পাওয়া যায় ৭ হাজার ৮০০ টাকা। আর ১৬ মণ ধান হলেও ৭০০ টাকা মণ দরে মোট বিক্রি হয় ১১ হাজার ২০০ টাকা। অর্থাৎ শুধু ধান বিক্রির হিসাবেই অনেক কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠছে না। এর সঙ্গে জমির ভাড়া, পারিবারিক শ্রম ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ হিসাব করলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

পবা উপজেলার কৃষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘চাষের সময় সবকিছুর দাম বেশি। সার, ওষুধ, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখন ধান বিক্রি করতে এসে যদি দাম কম পাই, তাহলে লাভ থাকবে কীভাবে?’

গোদাগাড়ীর কৃষক আব্দুল বাতেন বলেন, ‘ধান ঘরে তোলার পরই দোকানের বাকি, সেচের টাকা ও শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে হয়। তাই দাম কম হলেও ধান ধরে রাখার সুযোগ নেই। প্রয়োজনের তাগিদে দ্রুত বিক্রি করতে হচ্ছে।’

তানোরের কৃষক সারোয়ার বলেন, ‘আউশে ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারদর সন্তোষজনক না হওয়ায় ফলনের সুফল পাচ্ছি না। সামনে আমন মৌসুমের চাষাবাদের খরচও জোগাড় করতে হবে।’

কৃষকেরা জানান, গত মৌসুমের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু ধানের বাজারদর সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে ফলন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। বিশেষ করে ধারদেনা করে যারা আউশ আবাদ করেছেন, তাদের চাপ বেশি।

আবাদ কমলেও ফলন বেড়েছে

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৬ হাজার ৭১৬ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩০৪ হেক্টর জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। কর্তন করা জমিতে গড়ে প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৯০ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত আউশের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ৮৬৬ মেট্রিক টন।

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত মৌসুমে রাজশাহীতে আউশের আবাদ হয়েছিল ৮৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৫ মেট্রিক টন এবং গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৫২ মেট্রিক টন। অর্থাৎ গত মৌসুমের তুলনায় চলতি মৌসুমে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। তবে এখন পর্যন্ত কর্তন করা জমিতে গড় ফলন তুলনামূলক বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক পর্যায়ে সরকারি ধান ক্রয় বাড়ানো, বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, সার, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা আউশ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মিতা সরকার বলেন, ‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে আউশের আবাদ ও ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম থাকলে তাদের লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের।’

তিনি বলেন, ‘ধানের বাজারদর মূলত চাহিদা, সরবরাহ ও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। কৃষকেরা যাতে উৎপাদিত ধানের ভালো দাম পান, সে জন্য ধান কাটার পর যথাযথভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ এবং বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’