logo

নোনা জমিতেই বছরে আড়াই লাখ টাকা লাভ, ব্যতিক্রমী এক পদ্ধতিতে বদলেছে নোয়াখালীর কৃষি

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল
নোয়াখালী
নোনা জমিতেই বছরে আড়াই লাখ টাকা লাভ, ব্যতিক্রমী এক পদ্ধতিতে বদলেছে নোয়াখালীর কৃষি
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কৃষিজমি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এক যুগ আগেও নোয়াখালীর সদর ও সুবর্ণচরের বিস্তীর্ণ জমির বড় অংশই ছিল লবণাক্ত ও অনাবাদি। চাষাবাদ না হওয়ায় বছরের পর বছর পড়ে থাকত হাজার একর জমি। সেই নোনা মাটিতেই এখন যতদূর চোখ যায়, ততদূর শুধু সবুজের সমারোহ। পতিত জমিতে ফলছে নানা ধরনের সবজি, জলাধারে হচ্ছে মাছ চাষ, আর সেই মাছের ঘেরেই পালন করা হচ্ছে হাঁস।

নোয়াখালীর এই কৃষিচিত্রের পেছনে রয়েছে ‘সর্জন পদ্ধতি’ নামে ব্যতিক্রমী এক চাষপদ্ধতি। জলাধারের পাড়ে এবং পানির ওপর তৈরি মাচায় আঁটি বেঁধে শিম, শসা, বরবটি, করলা, লাউ, কুমড়া, ঝিঙে ও দুন্দুলসহ নানা সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা। একই জায়গায় মাছ, হাঁস ও সবজি চাষের এই সমন্বিত পদ্ধতিই বদলে দিয়েছে নোনা জমির কৃষির চেহারা।

সরেজমিনে জেলা শহর থেকে রওনা হয়ে দেখা মেলে নোয়াখালী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের নোয়াখালী মৌজার কৃষক আবদুর রহিম সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার আড়াই একর জমির কোনো অংশ আর অনাবাদি নেই। অথচ বছর দশেক আগেও এগুলো অনাবাদী পড়ে থাকতো। বাপ দাদার আমল থেকেই কৃষি কাজ করছেন, আর কোন কাজ শিখেননি। লাভ লোকসান যাই হোক কৃষি কাজই করতে হবে। আগে এসব পতিত জমিতে তেমন কোনো ফলন হতো না। বর্তমানে মাচা তৈরি করে সর্জন পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ করে খরচ বাদ দিয়েই প্রতিবছর তার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভ থাকে। যা দিয়ে সংসার ভালোভাবে চলছে।

কৃষক রহিম বলেন, অতি বৃষ্টির কারণে ফলন নষ্ট হয়ে ৭ লাখ টাকা লোকসানে হয়েছিল। আবার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সর্জন পদ্ধতিতে বরবটি, করলা, ঝিঙে, দুন্দুল চাষ করেছি। বাকি মৌসুম ঠিক থাকলে পুরোপুরি না হলেও ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে।

নোয়াখালী সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে কৃষিনির্ভর বিনোদপুর, ধর্মপুর, নোয়াখালী ও এওজবালিয়া ইউনিয়নের কয়েকশ একর জমি একসময় অনাবাদি পড়ে থাকত। একই চিত্র ছিল সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর, চরবাটা ও পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নেও। প্রায় দুই দশক আগেও এসব এলাকা ছিল বনদস্যু ও জলদস্যু অধ্যুষিত। সুবর্ণচরের এই তিন ইউনিয়নসংলগ্ন হাতিয়া উপজেলার হরণি, চানন্দী ও বয়ারচর ইউনিয়নের অবস্থাও ছিল একই রকম।

এসব এলাকার অনেক অংশই কয়েক দশক ধরে নদী থেকে জেগে ওঠা চর। চর জেগে ওঠার পর অনেকে বনভূমি উজাড় করে সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। দস্যুদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে জমি কিনে শুরু হয় বসতি স্থাপন। পরে চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের (সিডিএসপি) মাধ্যমে তাদের অনেকেই জমির ভোগদখলের স্বীকৃতি পান।

চরের নিচু জমিতে বসতি গড়তে হলে প্রথমেই তা উঁচু করে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ জন্য বসতঘরের পাশের জমি থেকেই মাটি কেটে নেওয়া হতো। পাশাপাশি লবণাক্ত এলাকায় বসবাস ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য খনন করা হতো পুকুর। পরে সেই পুকুরের মাটি দিয়ে জমি উঁচু করে সেখানে চাষাবাদ এবং পুকুরে মাছ চাষের সমন্বয় ঘটতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘সর্জন’ পদ্ধতি।

বর্তমানে এই পদ্ধতিই নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্জন পদ্ধতিতে সুবর্ণচরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর, হাতিয়ায় ২ হাজার ৯৬৫ হেক্টর, নোয়াখালী সদরে ১৯৭ হেক্টর, কবিরহাটে ৬৯২ হেক্টর এবং কোম্পানীগঞ্জ, সোনাইমুড়ী ও চাটখিলে ৫ হেক্টর করে জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে।

এসব জমিতে শসা, করলা, বরবটি, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, মিষ্টিকুমড়া ও লাউসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়। শুধু জমিই নয়, প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির মাচার নিচের জলাধারে তেলাপিয়া, রুই, কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছও চাষ করা হচ্ছে। অর্থাৎ একই জমিতে মাচার ওপর সবজি আর নিচের পানিতে মাছ—এই সমন্বিত চাষপদ্ধতিই এখন উপকূলের কৃষকদের জন্য হয়ে উঠেছে বিকল্প কৃষির এক কার্যকর মডেল।

জানা যায়, সর্জন পদ্ধতির চাষাবাদ শুরু হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ায়। সেখানে সর্জন নামে এক ব্যক্তি এই চাষ-পদ্ধতির প্রবর্তক। চরের বেশিরভাগ জমি অনাবদি পড়ে থাকতো আর কৃষকরা সনাতন পদ্ধতিতে স্থানীয় জাতের বীজের মাধ্যমে ধান চাষ করতেন। ২০১৪ সালের পরে আমাদের কৃষকরা ‘সর্জন’ চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং নিজ নিজ জমিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে কয়েক গুণ বেশি আয় করতে পারেন। এরপর থেকে চরে সর্জন পদ্ধতিতেই চাষাবাদ চলছে।

এ অঞ্চলের কৃষকরা জানান, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে সর্জন পদ্ধতিতে সবজির আবাদ হচ্ছে। স্বল্প খরচে অধিক আয়ের কারণে কৃষকদের কাছে এ পদ্ধতি হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। প্রতি একর জমিতে প্রায় এক লাখ টাকার সবজি উৎপাদন হয়। সর্জন পদ্ধতির এ উদ্যোগকে জেলা জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কৃষক তৈরি ও কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ ব্যবস্থা বা প্রণোদনা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষিবিদরা।

বিনোদপুরের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, বর্তমানে এক একর জমিতে শসা, সিম ও মাছ চাষ করছি। নিজের জমিতে উৎপাদিত সবজি ও মাছ বিক্রি করে যা আয় হয় তা নিয়ে আমরা অনেক সুখে আছি।

মোহাম্মদপুরের ভান্ডারী মার্কেটের দুলাল নামের একজন পাইকার বলেন, আমরা চরের কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্রয় করে জেলা শহর মাইজদী, দত্তেরহাট, কুমিল্লারসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করি। এই মৌসুমে ৬০-৬৪ টাকা করে শসা, ৮০ টাকা করে শিম, ৪০ টাকা করে চিচিঙ্গা ও লাউসহ পাঁচ লাখ টাকার সবজি কৃষকদের কাছ থেকে কিনেছি।

সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হারুন অর রশিদ জানান, এ অঞ্চলের প্রায় ৬ হাজার একর জমিতে বর্তমানে সর্জন পদ্ধতিতে শসা, বরবটি, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা’সহ উচ্চফলনশীল সবজি উৎপাদন হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাষীদের প্রশিক্ষণ, বীজ ও সারসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট নোয়াখালী কার্যালয়ের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইনচার্জ আমির ফয়সল বলেন, নোয়াখালীর লবণাক্ত ও জলাবদ্ধ জমিতে সর্জন পদ্ধতিতে সবজি ও মাছ চাষের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ পদ্ধতির মাধ্যমে অনাবাদি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে কোন কোন সবজি ও ফসল এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে, উৎপাদন খরচ ও কৃষকের লাভের পরিমাণ কতটা বাড়ানো যায়—এসব বিষয় নিয়ে মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় মাটি, পানি ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফসলের জাত নির্বাচন এবং সর্জন পদ্ধতিতে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কীভাবে সারা বছর এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়, সেটিও গবেষণার আওতায় রয়েছে। গবেষণার ফলাফল ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কৃষকদের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি ও চাষাবাদ পদ্ধতি সম্প্রসারণ করা হবে।