অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে ফেলে শিশুকে নিয়ে বাড়ি স্বামী, উদ্ধার করে মায়ের কাছে পাঠালেন ওসি

অপারেশনের পর সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন স্ত্রী মোছা. বিনা বেগম (২৫)। এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক কলহের জেরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে মাত্র দুই মাসের দুধের শিশুসন্তান মো. আতিকুলকে নিয়ে বাড়ি চলে যান স্বামী। বুকে দুধ জমে ব্যথা ও সন্তানকে কাছে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন বিনা। অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বারবার কাঁদছিল শিশুটিও।
খবর পেয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার বাবার মাধ্যমেই আবার হাসপাতালে মায়ের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম। সোমবার সন্ধ্যায় (২১ সেপ্টেম্বর) শিশুটি তার মায়ের কাছে ফিরে যায়।
সোমবার ভোরে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরোনো ভবনের চতুর্থতলার ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে শিশুটিকে নিয়ে বের হয়ে যান তার বাবা। খবর পেয়ে দুপুরে শিশুটিকে উদ্ধার করেন দিরাই থানার ওসি। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম নিপুন মিয়া (৩০)। তার বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের ভাটিয়াগাঁও গ্রামে।
জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে দিরাই উপজেলার ভাটিয়াগাঁও গ্রামের মো. নিপুন মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বানর এলাকার বিনা বেগমের। তাদের চারটি সন্তান রয়েছে। প্রথম সন্তান মেয়ের বয়স ৮ বছর, দ্বিতীয় সন্তান ছেলের বয়স ৬ বছর এবং তৃতীয় সন্তান মেয়ের বয়স ৫ বছর। তিন সন্তান বাড়িতে তাদের দাদা ও চাচা-চাচির কাছে রয়েছে।
মাসখানেক আগে স্ত্রী বিনা বেগমের পিত্তনালিতে পাথর ধরা পড়ে। ২০ দিন আগে তিনি সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। আট দিন আগে অপারেশন করে পিত্তনালি থেকে পাথর বের করা হয়। স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ স্বামীর দেওয়ার কথা থাকলেও দিনমজুর জামাইয়ের পাশে দাঁড়াতে জমি বিক্রি করে টাকা দেন শাশুড়ি মিনারা বেগম।
এদিকে, শাশুড়ির জমি বিক্রির পুরো টাকা নিজের কাছে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নিপুন মিয়া। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহ হয়। এর জেরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালের বিছানায় রেখে দুই মাসের দুধের শিশুসন্তান মো. আতিকুলকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন নিপুন।
স্বামী ও সন্তানকে হাসপাতালে না পেয়ে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানান অসুস্থ বিনা বেগম। পরে হাসপাতালের পুলিশ সদস্যরা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, সোমবার ভোর ৫টার দিকে শিশু আতিকুলকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন তার বাবা মো. নিপুন মিয়া ও দাদি রাজিয়া বেগম।
হাসপাতাল থেকে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে দিরাই থানা পুলিশকে জানানো হয়। এরপর দিরাই থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকা ভাটিয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে নিপুন মিয়াকে বুঝিয়ে তার মাধ্যমেই আবারও শিশুটিকে মায়ের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান তার বাবা।
মোছা. বিনা বেগম বলেন, ২০ দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। চিকিৎসার জন্য আমার মা দেড় লাখ টাকার জমি বিক্রি করেছেন। আট দিন আগে অপারেশন হয়েছে, ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমার স্বামী চায় সব টাকা তার কাছে রাখতে। এ নিয়ে আমার স্বামী গত রাত থেকেই ছেলেকে আমার কাছে দেয়নি। আজ ভোরে আমাকে না জানিয়ে আমার দুধের সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে চলে গেছে। দুধের চাপে আমার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে। হাসপাতালের পুলিশকে জানানোর পর তারা সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখেছেন, ভোর ৫টার দিকে ছেলেকে নিয়ে আমার স্বামী ও শাশুড়ি বের হয়ে গেছেন। পুলিশকে জানানোর পর সন্ধ্যার দিকে ছেলেকে হাসপাতালে আনা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী দিনমজুর। কাজ করে সংসার চালান। যা রোজগার হয়, তা দিয়েই সংসার চলে। কিন্তু প্রায়ই আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন ও মারধর করেন। তবুও স্বামী-সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করছি।
মো. নিপুন মিয়া বলেন, স্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা-কাটাকাটি হয়েছে। মাথা গরম হয়েছিল, তাই ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে এসেছিলাম। ওসি স্যার বাড়িতে এসেছিলেন। আবার ছেলেকে নিয়ে তার মায়ের কাছে যাচ্ছি।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, স্বামী-স্ত্রীর কলহের জেরে অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে দুই মাসের শিশুসন্তানকে নিয়ে বাড়িতে চলে এসেছিলেন স্বামী। হাসপাতাল থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তার বাড়ি থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে স্বামীকে বুঝিয়ে আবারও তার স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এত ছোট শিশু মা ছাড়া কীভাবে থাকবে? এছাড়া হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে, সন্তান কাছে না থাকায় মায়েরও কষ্ট হচ্ছে। তাই খবর পাওয়ার পরপরই নৌকা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
