logo

সব আছে, শুধু ট্রেন নেই: ময়মনসিংহে একে একে বন্ধ ১৮ স্টেশন!

কামরুজ্জামান মিন্টু
ময়মনসিংহ
সব আছে, শুধু ট্রেন নেই: ময়মনসিংহে একে একে বন্ধ ১৮ স্টেশন!
ঈশ্বরগঞ্জে অবস্থিত বন্ধ সোহাগী রেলস্টেশন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ময়মনসিংহের সুতিয়াখালী রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকলে এখন বোঝার উপায় নেই, একসময় এই জায়গাটি ছিল মানুষের ব্যস্ততায় মুখর। টিকিট কাউন্টারে লাইন, প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের অপেক্ষা, হকারদের হাঁকডাক—সবই এখন অতীত। রেললাইনটি আছে, স্টেশনও আছে, প্ল্যাটফর্মও আছে; নেই শুধু নিয়মিত ট্রেন। প্রায় দুই যুগ ধরে এভাবেই পড়ে আছে স্টেশনটি।

শুধু সুতিয়াখালী নয়, ময়মনসিংহ ও আশপাশের জেলাগুলোর বেশ কয়েকটি রেলস্টেশনের চিত্র প্রায় একই। কোথাও এক যুগ, কোথাও দুই যুগ ধরে ট্রেন থামে না। আবার যেসব পথে স্টেশন এখনো চালু, সেসব পথের অনেক লোকাল ট্রেনও বছরের পর বছর বন্ধ। ফলে রেলপথ আছে, কিন্তু সেই রেলপথের ওপর নির্ভরশীল মানুষের যাতায়াতের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেল যোগাযোগের এই সংকটের পেছনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে ইঞ্জিন ও জনবলসংকটের কথা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কয়েক বছর ধরে একই সংকট থাকলেও এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন? আর বছরের পর বছর বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর অবকাঠামো, সম্পদ ও স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতির হিসাবই বা হচ্ছে কতটা?

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ পথে ২০২৪ সাল থেকে দুই জোড়া ট্রেন বন্ধ। ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ পথে দুই জোড়া ট্রেনের মধ্যে এক জোড়া ২০২০ সাল থেকে এবং আরেক জোড়া ২০২৫ সাল থেকে বন্ধ। ময়মনসিংহ-ভৈরব পথের দুই জোড়া ট্রেনও ২০২০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ একসময় যেসব রুটে স্বল্প খরচে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করতেন, সেসব রুটেই এখন যাত্রীদের বড় অংশকে সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটের ভাওয়াল এক্সপ্রেস, ভূঞাপুর-ময়মনসিংহ রুটের ধলেশ্বরী এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি মেইল ট্রেনও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ঢাকা থেকে ভৈরব হয়ে ময়মনসিংহ চলাচলকারী ইশা খাঁ এক্সপ্রেসও প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ। ময়মনসিংহ-ভৈরব রুটের এই ট্রেনটি বন্ধ থাকার পাশাপাশি এ পথে আরও দুই জোড়া লোকাল ট্রেনও প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ।

এর মধ্যে নতুন করে সংকট বাড়িয়েছে ময়মনসিংহ মেইলের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। ২৪ আগস্ট থেকে ট্রেনটি বন্ধ থাকায় ভূঞাপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে চট্টগ্রামমুখী যাত্রীদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেলস্টেশনগুলোর দিকে তাকালে সমস্যার আরেকটি চিত্র স্পষ্ট হয়। ময়মনসিংহ সদরের বাইগনবাড়ী, গৌরীপুরের বিসকা, ঈশ্বরগঞ্জের ঈশ্বরগঞ্জ ও সোহাগী, নান্দাইলের নান্দাইল, নেত্রকোনা সদরের ঠাকুরকোনা, জামালপুরের বাউসী, শহীদ নগর/বারইপটল ও কোর্ট, মেলান্দহের দুরমুঠ, ইসলামপুরের মোশারফগঞ্জ, টাঙ্গাইলের গোপালপুরের হেমনগর, ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ এবং কিশোরগঞ্জ সদরের নীলগঞ্জ স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

এর মধ্যে ময়মনসিংহ সদরের সুতিয়াখালী, ত্রিশালের ধলা, গাজীপুরের শ্রীপুরের সাতখামাইর ও ইজ্জতপুর স্টেশন প্রায় দুই যুগ ধরে বন্ধ। গৌরীপুরের বিসকা, ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী এবং নান্দাইল স্টেশন বন্ধ প্রায় এক যুগ ধরে। কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ স্টেশনও প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ। ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ স্টেশন বন্ধ রয়েছে প্রায় দুই যুগ।

ঈশ্বরগঞ্জের সোহাগী এলাকার বাসিন্দা মধ্যবয়সী আনোয়ার হোসেন। তিনি রেলে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আনোয়ার বলেন, আগে ট্রেনে যাতায়াত করলে ভাড়া কম লাগত, সময়ও মোটামুটি নির্ধারিত থাকত। এখন বাসে যেতে হয়। ভাড়া বেশি, যানজটের ঝুঁকি আছে, আবার পথে গাড়ি পরিবর্তনের প্রয়োজনও পড়ে। আমার মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের যাত্রীদের জন্য রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি পরিবহনব্যবস্থা হারানো নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাড়তি ব্যয়।

বন্ধ হওয়া রেললাইনের জরাজীর্ণ অবস্থা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বন্ধ হওয়া রেললাইনের জরাজীর্ণ অবস্থা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নান্দাইলের কৃষক আব্দুল জলিলের অভিজ্ঞতাও একই। তিনি স্থানীয় বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে যাতায়াত করেন। তার ভাষ্য, আগে রেলপথে পণ্য পাঠানোর সুযোগ থাকায় খরচ কম ছিল। এখন ভ্যান বা ট্রাকে পণ্য পাঠাতে হয়। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় পণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়ে।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে কথা হয় সাদিক হাসান নামে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তার ভাষ্য, একটি ট্রেন বন্ধ হলে শুধু একজন যাত্রী সমস্যায় পড়েন না। একই রুটে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাদের প্রত্যেকের বাড়তি ভাড়া, বাড়তি সময় সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বড়।

বিসকা রেলস্টেশনে একসময় নিয়মিত চা বিক্রি করতেন আদিল মিয়া। এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, আগে ট্রেন আসার সময় দোকানে ভিড় থাকত। যাত্রীরা চা, পানি, খাবার কিনতেন। এখন ট্রেন নেই, যাত্রীও নেই। ফলে ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রি করছি। তবে আগের মতো টাকা রোজগার হয় না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা স্টেশনগুলোর অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ এসব স্টেশন ভবন ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কোথাও কোথাও রেলওয়ের সম্পদ চুরি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় নাগরিকদের একটি অংশের অভিযোগ, সড়ক পরিবহননির্ভর একটি ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে রেল যোগাযোগ সচল রাখার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। তাঁদের যুক্তি, ট্রেন বন্ধ হলে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রী সড়কপথে চলে যান। এতে বাস ও অন্যান্য সড়ক পরিবহনের যাত্রী বাড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগরের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, লোকাল ট্রেনকে আমরা মূলত গরিবের ট্রেন বলি। কারণ, নিম্নআয়ের মানুষ, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষই এসব ট্রেনে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত করেন। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ অঞ্চলের একের পর এক লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষের সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য যাতায়াতের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক মানুষ সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে চলাচল করছেন। এতে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যাও বেড়ছে। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের আশঙ্কা, লোকাল ট্রেনগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে পরিবহন খাতের কোনো অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রেলওয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা এর সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনা দরকার। আমরা কাউকে আগাম দায়ী করছি না; তবে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি। এর পেছনে কারও অনিয়ম, স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বা অশুভ তৎপরতা রয়েছে কি না তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহনের স্বার্থে লোকাল ট্রেন চালু করা হোক।

ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ.এইচ.এম খালেকুজ্জামান বলেন, ট্রেন বন্ধ শুধু একটি যাত্রার সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, স্থানীয় বাজার আর পণ্য পরিবহনের অর্থনীতি। তাই মানুষের দাবি, ইঞ্জিন সংকটের দ্রুত সমাধান করে ময়মনসিংহ অঞ্চলে বন্ধ থাকা ট্রেন ও স্টেশনগুলো আবার চালু করা হোক। তাহলেই কমবে যাতায়াতের খরচ, গতি ফিরবে পণ্য পরিবহনে, আর প্রাণ ফিরবে রেলস্টেশনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতে।

ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশনের স্টেশন সুপার আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, জারিয়া লোকাল ট্রেন চালু থাকলেও এটি অনিয়মিত অবস্থায় চলছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে ময়মনসিংহের বাকি সবগুলো লোকাল ট্রেন বন্ধ আছে। ইঞ্জিন পেলে আবার ট্রেনগুলো চালু করা যাবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, একদিকে ইঞ্জিন সংকট, অন্যদিকে কিছু জনবল সংকটও রয়েছে। তবে ইঞ্জিন পেলে ট্রেন চালু হলে স্টেশনও সচল করা যাবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে, ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হাসান বলেন, লোকাল ট্রেন চালুর উদ্যোগ ইতোমধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিন কেনার জন্য রেলওয়ের মেকানিকাল বিভাগ ইতোমধ্যে টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। ইঞ্জিনের পাশাপাশি বগি কেনার জন্যও টেন্ডার করা হচ্ছে। টেন্ডারিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইঞ্জিন ও বগি পাওয়া গেলে বন্ধ থাকা লোকাল ট্রেনগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে রেললাইন সচল করতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ সম্পন্ন করে লাইনগুলো ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে।