ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের তীরে অশ্রু-আনন্দে দেবী দুর্গাকে বিদায়

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। বিদায়ের ক্ষণে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ভিড় জমান হাজারো ভক্ত। কারও চোখে অশ্রু, তো কারও মুখে উৎসবের দীপ্তি। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি আর ভক্তদের আবেগঘন ভালোবাসায় দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তারা।
নগরের বিভিন্ন মন্দির ও পাড়ার পূজামণ্ডপ থেকে একে একে প্রতিমা নিয়ে আসা হয় ব্রহ্মপুত্রের তীরে। বিসর্জনের আগে দেবীর পায়ে প্রণাম জানিয়ে শেষবারের মতো আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন ভক্তরা। এরপর ধর্মীয় রীতি মেনে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। মুহূর্তটিতে নদীর তীরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
বিদায়ের বেদনার মধ্যেও উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়নি। অনেক ভক্ত ঢাকের তালে নেচে-গেয়ে ও একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা ভাগাভাগি করে শেষ মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখেন। কারও হাতে ছিল ফুল, কারও কপালে সিঁদুরের ছোঁয়া। প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তুলে উৎসবের স্মৃতি ধরে রাখতেও দেখা যায় অনেককে।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে নগরের বিভিন্ন মণ্ডপে ছিল বিশেষ পূজার্চনা ও সিঁদুর খেলার আয়োজন। সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা দেবী দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার সংসারের মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী সৌভাগ্য কামনার প্রতীক।
বিসর্জন দেখতে আসা পূজা রানী দাস নামে এক ভক্ত বলেন, কয়েক দিন ধরে মণ্ডপে মণ্ডপে আনন্দ করেছি। আজ দেবীকে বিদায় জানাতে এসে মনটা ভারী হয়ে উঠেছে। তবে বিশ্বাস করি, তিনি আবারও ফিরে আসবেন। এখন সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনব।
শুভঙ্কর সাহা নামে আরেক ভক্ত বলেন, দুর্গাপূজা শুধু পুজো-অর্চনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের মিলন ও আনন্দের উৎসব। গত কয়েক দিনে সবার সঙ্গে দেখা হয়েছে, আনন্দ করেছি। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হলেও এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে থেকে যাবে।
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ময়মনসিংহ নগরের বিভিন্ন এলাকা সাজানো হয়েছিল বর্ণিল আলোকসজ্জা, আকর্ষণীয় তোরণ ও নান্দনিক সাজে। পূজার দিনগুলোতে মণ্ডপগুলোতে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা উৎসবমুখর কর্মসূচি।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শরৎকালে দেবী দুর্গা কৈলাস ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আগমন করেন। ভক্তদের মাঝে কয়েক দিন অবস্থান ও পূজার্চনা শেষে বিজয়া দশমীতে তিনি পুনরায় কৈলাসে ফিরে যান। এই আগমন ও বিদায়ের মধ্য দিয়েই আবর্তিত হয় শারদীয় দুর্গোৎসবের চিরায়ত আয়োজন।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহেও পূজামণ্ডপগুলোতে চলে পূজা-অর্চনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটল সেই উৎসবের আনুষ্ঠানিক পর্ব।
ব্রহ্মপুত্রের জলে প্রতিমা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো উৎসবের কয়েকটি আনন্দঘন দিন। তবে ভক্তদের হৃদয়ে থেকে গেল দেবীর চরণে জানানো প্রার্থনা, সম্প্রীতির বন্ধন আর আগামী শরতে তার পুনরায় আগমনের আকুল প্রতীক্ষা।
ময়মনসিংহ জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় মোট ৮০৬টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ময়মনসিংহ নগরীতেই ৯০টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন ছিল।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক শংকর সাহা বলেন, এবার অত্যন্ত উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হয়েছে।
ময়মনসিংহ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, পূজাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে।
