সেবা না দিয়েই আশেক মাহমুদ কলেজে বছরে ৬৭ লাখ টাকা ফি আদায়

পরিবহন ও চিকিৎসা সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে ফি। এ ছাড়া অনুমোদন না থাকা কয়েকটি খাত থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে কলেজটিতে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত ফি আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কোনো সেবা না দিয়ে এবং সরকারি বিধি ভেঙে এভাবে অর্থ আদায় করায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের গত বছরের ২২ এপ্রিলের স্মারক অনুযায়ী ‘সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিকট হতে আদায়কৃত অর্থের আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সংশোধিত নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। পরিপত্রের তফসিল ‘খ’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কলেজটিতে অনুমোদন না থাকা কয়েকটি খাতে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। একই সাথে অনুমোদিত কিছু খাতেও একাধিকবার টাকা নেওয়া হচ্ছে।
কলেজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন ২ হাজার ১৪৮ জন শিক্ষার্থী। আর সম্মান, ডিগ্রি, মাস্টার্স ও প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স মিলিয়ে কলেজটিতে বর্তমানে প্রায় ১১ হাজার ২২২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে পরিবহন ফি নিয়ে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পরিবহন সুবিধা থাকলেই কেবল এ খাতে অর্থ আদায় করা যাবে। অথচ কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকলেও জনপ্রতি ২০০ টাকা করে পরিবহন ফি নেওয়া হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ২২ লাখ ৪৪ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
আইসিটি ফি নিয়েও রয়েছে সংশয়। সরকারি নীতিমালায় আইসিটি ফি নামে কোনো অনুমোদিত খাত না থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১২০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। বিভিন্ন বর্ষ ও কোর্স মিলিয়ে এ খাতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪০ টাকা সংগ্রহ করার তথ্য মিলেছে।
একইভাবে চিকিৎসা ফি নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। নীতিমালা অনুযায়ী যেসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা রয়েছে, কেবল সেসব প্রতিষ্ঠানই এ খাতে অর্থ নিতে পারবে। কিন্তু কলেজে কোনো চিকিৎসাসেবা না থাকলেও নিয়মিত ফি হিসেবে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
এছাড়া ‘অতিথি শিক্ষক ফি’ নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে, যার কোনো উল্লেখ সরকারি পরিপত্রে নেই। কেবল প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই এ খাতে প্রায় ৩ লাখ ২২ লাখ ২০০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
উন্নয়ন তহবিলের ক্ষেত্রেও নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম বর্ষে এককালীন উন্নয়ন ফি নেওয়ার কথা থাকলেও কলেজে প্রতি বর্ষে ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে।
পরিচয়পত্রের ফি আদায়েও একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে। পরিপত্রে প্রথম বর্ষে একবার ফি নেওয়ার কথা বলা হলেও কলেজে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষেও অর্থ আদায় করা হচ্ছে; যার পরিমাণ বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭০০ টাকা। এমনকি ব্যবস্থাপনা ফি নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা করে আদায় করায় বছরে বাড়তী আদায় হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ ৬১ হাজার ১০০ টাকা।
ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, রোভার স্কাউট ও বিএনসিসি খাতেও একই অর্থ দুইবার আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ভর্তি বিজ্ঞপ্তির সময় এসব খাতে অর্থ নেওয়ার পর সেশন ফি’র আওতায় থাকা পৃথক খাতেও একই বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কেবল প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই এসব খাতে অতিরিক্ত প্রায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৪০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অভিযোগ নিরাপত্তা, নৈশপ্রহরী ও অত্যাবশ্যকীয় কর্মচারী খাত নিয়ে। এ খাতে সেশন ফির সাথে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজটিতে প্রায় ৭৯ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন; যার মধ্যে মাত্র নয়জনের বেতন সরকারি বরাদ্দ থেকে দেওয়া হয়। বাকি ৭০ জন কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করা হয় শিক্ষার্থীদের দেওয়া অর্থ থেকে।
কর্মচারীদের হিসাবমতে, তাদের মানভেদে সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে ৭০ জন কর্মচারীর মাসিক বেতন ও জোড়া উৎসব বোনাসসহ বছরে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেবল এ খাতেই বছরে প্রায় ৫ লাখ ৮৪ হাজার ২০০ টাকা অতিরিক্ত টাকা আদায় হচ্ছে। উল্লেখ্য, পরিপত্রে অনিয়মিত শ্রমিকের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০১৮’ বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।
সার্বিকভাবে বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ৬৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হলেও এই বাড়তি টাকা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ
কলেজের শিক্ষার্থী শাওন বলেন, প্রতি বছর ভর্তি ও সেশন ফি দিতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন খাতে টাকা দিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে বাস বা চিকিৎসা—কোনো সুবিধারই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা জানতে চাই, আমাদের এই টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
আরেক শিক্ষার্থী আহমেদ বলেন, কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে অনেকে পড়তে আসে, অথচ সেবার মান না বাড়িয়ে ফি বাড়ানো হচ্ছে। আমরা চাই কলেজ কর্তৃপক্ষ খাতভিত্তিক আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে আনুক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, যে সুবিধা নেই—তার নামে টাকা নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এ বিষয়ে কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব বায়জিদ বলেন, আমাদের কলেজে কোনো পরিবহন নেই, তবুও পরিবহন ফি নেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, যেসব সুবিধার অস্তিত্ব নেই, তার নামে অর্থ আদায় করা স্পষ্ট দুর্নীতি। দ্রুত কলেজ প্রশাসনকে এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শওকত আলম বলেন, মাস্টাররোল কর্মচারী বা ফি আদায়ে সরকারের যে পরিপত্র আছে, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কোনো সরকারি কলেজের নেই। আমরাও পরিপত্রের বাইরে অবস্থান করছি না। আর বর্তমানে নতুন কোনো কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
কর্তৃপক্ষ অনিয়মের কথা অস্বীকার করলেও ফি কাঠামোর এই স্পষ্ট অসঙ্গতি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।



