logo

চিংড়ির ঘেরে এবার শোল চাষ, বদলাচ্ছে খুলনার চাষিদের জীবন

চিংড়ির ঘেরে এবার শোল চাষ, বদলাচ্ছে খুলনার চাষিদের জীবন
জাল টেনে শোল মাছ ধরছেন চাষিরা (বামে); পাত্রে রাখা বিক্রির উপযোগী তাজা শোল মাছ (ডানে)। ছবি: এশিয়া পোস্ট

চিংড়ি চাষে ভাইরাসের আক্রমণ, লবণপানির সংকট, খরা ও অতিবৃষ্টির কারণে বারবার লোকসানের মুখে পড়ছেন খুলনার চাষিরা। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে দেশি প্রজাতির শোল মাছ চাষে ঝুঁকছেন তারা।

ডুমুরিয়া ও পাইকগাছার বিভিন্ন এলাকায় ছোট পুকুরে শোল চাষ করে কেউ ফিরেছেন আর্থিক স্বচ্ছলতায়, কেউবা গড়ে তুলছেন নতুন কর্মসংস্থান। চাষিদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্যদেরও আগ্রহ বাড়ছে। একসময় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা জাকিরের মতো অনেকের কাছেই শোল মাছ চাষ এখন স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ।

ডুমুরিয়ার চাষি উত্তম মণ্ডল একসময় চিংড়ি চাষ করতেন। বারবার লোকসানের মুখে পড়ে চলতি বছর ৫০ শতক জমির চারটি পুকুরে ১২ হাজার ৪০০টি শোল মাছের পোনা ছাড়েন তিনি। পাঁচ মাসে মাছের গড় ওজন হয়েছে প্রায় এক কেজি। বর্তমানে প্রতি কেজি মাছ বিক্রি করছেন ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা দরে। উত্তম জানান, চারটি পুকুরে তার খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা। মাছ বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।

পাইকগাছার চাঁদখালী ইউনিয়নের গড়েরাবাদ গ্রামের জাকিরের জীবনেও পরিবর্তন এনেছে শোল মাছ চাষ। একসময় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। দুই বছর আগে সরকারি চাকরিজীবী চাচাতো ভাই রেজওয়ানের সহযোগিতায় যৌথভাবে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি পোনা ছেড়ে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেন তারা। এতে খরচ হয়েছিল ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বছরে ২ হাজার ৫০০টি পোনা থেকে মাছ বিক্রি করেন ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার, যেখানে খরচ হয় ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। দুই বছরের অভিজ্ঞতায় এখন নিজেই মাছ চাষের উদ্যোগ নিয়েছেন জাকির। অন্যদিকে, রেজওয়ান নতুন করে ২ হাজার ৫০০ পোনা ছেড়েছেন।

রেজওয়ান বলেন, এলাকায় শোল মাছ চাষের প্রসার দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে এলাকার বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির চিন্তা থেকে চাচাতো ভাইকে নিয়ে চাষ শুরু করেন। তার মতে, বেকারদের কেবল কাজ করার পরামর্শ দিলেই হবে না, তাদের পুঁজির ব্যবস্থাও করতে হবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা বিশ্বস্ত মানুষের হাতে পুঁজি তুলে দিলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। তবে মাছ চাষে পুকুরের আয়তন অনুযায়ী পোনা ছাড়া, পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া ও আগাম পরিকল্পনা করা জরুরি।

পাইকগাছার চাঁদখালী ইউনিয়নের বাদুড়িয়া গ্রামে শোল মাছ চাষ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। গ্রামটিতে প্রায় তিন শতাধিক পুকুরে এ মাছের চাষ হচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকে গ্রামটিকে এখন ‘শোল মাছের রাজধানী’ বলে ডাকেন। মাছের খাদ্য তৈরি, পুকুর পরিচর্যা ও বিপণন ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ। নারীরাও অংশ নিচ্ছেন মাছের খাদ্য তৈরির কাজে।

স্থানীয় চাষি মো. হাসান ছয় শতকের পুকুরে ২ হাজার ৬০০ পোনা ছেড়েছেন। সাত থেকে আট মাসে মাছের ওজন ৭০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত হয়। বছরে তার খরচ সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা আর মাছ বিক্রি করেন সাত থেকে আট লাখ টাকার।

চাষি মো. উজ্জ্বল গাজী বলেন, গত বছর ১৫ শতকের দুটি পুকুরে ২ হাজার ৬৭০টি শোল মাছ চাষ করে প্রায় ৯ লাখ ১০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। যেখানে খরচ হয়েছিল চার লাখ টাকা। এ বছর সাড়ে চার হাজার পোনা ছেড়েছেন তিনি; আশা করছেন, বিক্রি হবে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার মাছ। প্রায় ছয় বছর ধরে শোল চাষ করে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। বাদুড়িয়ার মাছ এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি শোল বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৩০০ টাকায়।

ডুমুরিয়ার শোভনা ইউনিয়নের মাদারতলা গ্রামের লক্ষ্মী মণ্ডলও শোল চাষে সাফল্য পেয়েছেন। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ শতকের পুকুরে চার হাজার পোনা ছাড়েন তিনি। পোনা বেঁচে থাকার হার ছিল ৮০ শতাংশ। ২১০ দিনে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। মাছ বিক্রি করে আট লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি। বর্তমানে তার পুকুরের মাছের গড় ওজন ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম।

লক্ষ্মী মণ্ডল বলেন, শুরুতে মৎস্য বিভাগ ছাড়া কেউ তাকে উৎসাহ দেননি। প্রশিক্ষণ ও পোনা পেয়ে চাষ শুরু করেন। তার সাফল্য দেখে এখন অনেকে দেশি মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ভবিষ্যতে শোলের পাশাপাশি কৈ, টাকি ও চিতল মাছ চাষ এবং সংরক্ষণে কাজ করতে চান তিনি।

ডুমুরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, চিংড়িপ্রধান এলাকায় অল্প জায়গায় দেশি মাছের চাষ জনপ্রিয় হওয়া ও লাভের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। মাছ চাষকে আরও সমৃদ্ধ করতে তারা কাজ করছেন।

পাইকগাছার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক বলেন, জীবিকার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে স্থানীয়দের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে।

খুলনা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিপুল কুমার বসাক বলেন, উন্নয়ন-সম্পর্কিত প্রকল্প অনুমোদিত হলে চিংড়িচাষিরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাবেন। পাশাপাশি ঘেরের উন্নয়ন এবং মানসম্মত হ্যাচারি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

ডুমুরিয়া উপজেলায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ১৯ হাজার ৭৫২ হেক্টর এবং পাইকগাছায় ২৩ হাজার ১০৮ হেক্টর। সংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্মত পোনা, সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে দেশি মাছ চাষের সম্ভাবনা আরও বহুগুণ বাড়বে। চিংড়ি চাষের অনিশ্চয়তার মধ্যে শোল মাছ এখন খুলনার চাষিদের কাছে বিকল্প আয়ের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি পথ হয়ে উঠেছে।