logo

কুড়িগ্রামের নদ-নদীতে রাতে চলছে বিদ্যুতের শকে মাছ নিধন

জুয়েল রানা
কুড়িগ্রাম
কুড়িগ্রামের নদ-নদীতে রাতে চলছে বিদ্যুতের শকে মাছ নিধন
নৌকায় ব্যাটারি ও লম্বা লাঠির মাথায় বিশেষ তার যুক্ত করে বিদ্যুতের শক দিয়ে ধরা হচ্ছে মাছ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কুড়িগ্রামের দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদে সূর্য ডোবার পরপরই শুরু হয় বেপরোয়া মাছ নিধন। নৌকায় ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মাধ্যমে হাই-ভোল্টেজ বিদ্যুতের শক দিয়ে নির্বিচারে ধরা হচ্ছে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এই প্রক্রিয়ায় বড় মাছের পাশাপাশি মারা পড়ছে রেনু-পোনা ও ডিম। ফলে নদ-নদীর প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বৈধ জেলেরা। তাদের অভিযোগ, সরকারি নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় এই অবৈধ পন্থা দিনদিন আরও বিস্তার লাভ করছে।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুধকুমার নদে গিয়ে দেখা যায়, ছোট ছোট নৌকায় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি, ইনভার্টার ও বৈদ্যুতিক তারযুক্ত বিশেষ যন্ত্র বসিয়ে মাছ শিকার করা হচ্ছে। একেকটি নৌকায় থাকেন কয়েকজন জেলে। তাদের মধ্যে একজনের হাতে থাকে একটি লম্বা লাঠি, যার মাথায় প্যাঁচানো গোলাকার যন্ত্র পানিতে নামিয়ে বিদ্যুতের শক দেওয়া হয়। শকের প্রভাবে মুহূর্তের মধ্যেই আশপাশের মাছ অচেতন হয়ে পানির ওপর ভেসে ওঠে। এরপর জাল বা হাত দিয়ে মাছগুলো তুলে নেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, দিনে দু-একটি নৌকা দেখা গেলেও রাত গভীর হলেই নদীতে নেমে পড়ে শতাধিক নৌকা। দুধকুমারের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চরাঞ্চলেও একইভাবে বিদ্যুতের শক দিয়ে চলে মাছ শিকার।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা খালেক মিয়া বলেন, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রে রাতে কমপক্ষে একশটি নৌকা বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরে। এতে ছোট-বড় কোনো মাছই রক্ষা পাচ্ছে না। এখনই এটি বন্ধ না করলে একসময় দেশীয় মাছের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।

প্রথাগতভাবে জাল দিয়ে মাছ ধরা জেলে অতুল চন্দ্র আক্ষেপ করে বলেন, আমরা সারারাত জাল ফেলে যা পাই, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। কিন্তু যারা বিদ্যুতের শক দেয়, তারা অল্প সময়েই প্রচুর মাছ ধরে নিয়ে যায়। এতে আমাদের আয় যেমন কমছে, তেমনি নদীর মৎস্যসম্পদও ধ্বংস হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না বেগম জানান, রাতে নদীর দিকে তাকালে সারি সারি নৌকার আলো দেখা যায়। সবাই জানে সেখানে কী ঘটছে, কিন্তু প্রশাসন কোনো জোরালো অভিযান চালায় না। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপই পারে এই অপকর্ম বন্ধ করতে।

কুড়িগ্রামের নদ-নদী একসময় দেশীয় মৎস্যসম্পদে ভরপুর ছিল। দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তায় মিলত বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, টেংরা, পাবদা, পুঁটি ও খলিসাসহ নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও বিদ্যুতের শকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় এসব মাছের দেখা মেলা এখন দায়।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এটি নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শকের প্রভাবে কাঙ্ক্ষিত মাছের সঙ্গে সঙ্গে পোনা, ডিম, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

পরিবেশকর্মী সুজন মোহন্ত বলেন, শুধু কাগজে-কলমে আইন থাকলে চলবে না, তার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নদীতে নিয়মিত টহল, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা এবং অবৈধ যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করা জরুরি। তা না হলে প্রাকৃতিক উৎসের দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, বিদ্যুতের শক দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। যেহেতু তারা রাতে সুযোগ বুঝে মাছ ধরে, তাই তাদের হাতেনাতে ধরতে কিছু কৌশলগত সমস্যা হচ্ছে। তবে বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি, শীঘ্রই অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।