মুসল্লিদের ৮ লাখ টাকা নিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ উধাও ইমাম

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় স্বর্ণের হার দেওয়ার প্রলোভন ও ব্যক্তিগত সংকটের কথা বলে মুসল্লিদের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিজানুর রহমান নামে এক ইমামের বিরুদ্ধে। টাকা নেওয়ার পর স্ত্রী-সন্তানসহ তিনি উধাও হয়ে যান। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মেলান্দহ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম মাহমুদুল হক। অভিযুক্ত মিজানুর রহমান উপজেলার মালঞ্চ জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব।
মসজিদে নিয়োগের সময় জমা দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, মিজানুর রহমানের বাবার নাম ইসমাঈল মজুমদার এবং মা হাসিনা মাহমুদা নার্গিস। তার বর্তমান ঠিকানা ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকায় এবং স্থায়ী ঠিকানা কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার উত্তর গাজিপুরে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রায় তিন মাস আগে মালঞ্চ জামে মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে যোগ দেন মিজানুর রহমান। অল্প সময়েই তিনি স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর আস্থা অর্জন করেন। সেই আস্থাকেই পুঁজি করে বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত আর্থিক সংকট, বেতন না পাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার নেন।
থানায় অভিযোগকারী মো. জুবায়ের জানান, মিজানুর রহমান মসজিদের মক্তব শিক্ষক হিসেবেও কর্মরত। গত ৫ অক্টোবর মিজানুর রহমান তার কাছে অর্থের প্রয়োজনের কথা বলেন। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে হংকং থেকে আসা একটি স্বর্ণের নেকলেসের ছবি দেখিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই টাকা পরিশোধ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। মসজিদের ইমাম হওয়ায় তাকে বিশ্বাস করে তিনি নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন।
একই ধরনের আশ্বাসে পরদিন স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ইমরানের কাছ থেকেও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর মাস্টারের কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা, আব্দুল্লাহর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা, কাদেরের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং ইসমাঈল হোসেন রাজার কাছ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার দুপুর পর্যন্ত সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। অভিযুক্ত ইমাম মুসল্লিদের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন এবং স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করেন। কিন্তু এরপর থেকেই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
টাকা হারিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অভিযোগকারী জুবায়ের। তিনি বিকাশ, নগদ ও ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা করেন। ব্যবসার মূলধনের বড় একটি অংশই তিনি ইমামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জুবায়ের বলেন, ‘একজন মসজিদের ইমাম মানুষের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের জায়গা। তিনি যদি এমন করেন, তাহলে আমরা কার ওপর বিশ্বাস করব? আমি গরিব মানুষ। অনেক কষ্ট করে ব্যবসার টাকা জমিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা না পেয়ে খুব সমস্যার মধ্যে আছি। আপনারা আমার টাকাটা উদ্ধার করার ব্যবস্থা করেন।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানাতে মিজানুর রহমানের ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়ায় যায়। এ বিষয়ে মালঞ্চ জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুর রহিম বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি আমরা আগে জানতাম না। কেউ অর্থ লেনদেনের আগে মসজিদ পরিচালনা কমিটিকে অবহিত করেননি। বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত কমিটির সভা আহ্বান করব এবং আইনগতভাবে করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। প্রায় তিন মাস আগে তিনি এই মসজিদে নিয়োগ পেয়েছেন। এত স্বল্প সময়ে তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে মেলান্দহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম মাহমুদুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক রয়েছেন। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর পর্যালোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
