logo

পদ্মে সেজেছে চলনবিল, সৌন্দর্য দেখতে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা

রানা আহমেদ
সিরাজগঞ্জ
পদ্মে সেজেছে চলনবিল, সৌন্দর্য দেখতে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা
চলনবিলে ফুটে থাকা অজস্র পদ্ম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিলের শান্ত জলে হালকা বাতাসের মৃদু ঢেউ। সেই ঢেউয়ের বুক চিরে মাথা তুলে আছে অসংখ্য পদ্ম। কোনোটি সবে কলি মেলেছে, কোনোটি পূর্ণ প্রস্ফুটিত, আবার কোনোটি রোদ ছুঁয়ে যেন মিষ্টি হাসছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় জল নয়, যেন এক বিশাল সবুজ ক্যানভাস। তার ওপর প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকে দিয়েছে সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের শত শত ফুল।

মনোরম এ দৃশ্য এখন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার শাকুয়াদিঘি এলাকার বাঘমারা বিলের।

চলনবিলের বুকজুড়ে ফুটে থাকা পদ্ম দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন নানা বয়সি মানুষ। কেউ প্রকৃতির এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছেন, কেউ মোবাইল ফোনে ফ্রেমে বন্দি করছেন প্রিয় মুহূর্ত, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিলের পাড়ে। একসময় যে পদ্ম হারিয়ে গিয়েছিল এ অঞ্চল থেকে, দীর্ঘ নীরবতার পর সেই পদ্মই আবার ফিরে এসে জানান দিচ্ছে, সুযোগ পেলে প্রকৃতি তার হারানো সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে জানে।

সরেজমিনে বাঘমারা বিলে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায়, জলের ওপর ছড়িয়ে আছে পদ্মপাতা। তার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে শত শত ফুল।

ভাদ্রের শুরুতেই কলি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে শুরু করেছে পদ্ম। স্থানীয়দের মতে, আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে শীতের আগমন পর্যন্ত চলবে এই ফুলের মেলা।

তাড়াশের নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক সনাতন কুমার দাশ বলেন, প্রায় চার দশক এই এলাকায় পদ্মের দেখা মেলেনি। তবে দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সাল থেকে বাঘমারা বিলে নিয়মিত পদ্ম ফুটতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই যেন পুরোনো কোনো স্মৃতি ফিরে এসেছে এই বিলে।

সনাতন কুমার দাশ আরও জানান, পদ্মের এই ফিরে আসা শুধু তাড়াশের মানুষকে নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদেরও আকৃষ্ট করেছে। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন বহু মানুষ ছুটে আসছেন এখানে।

জীববিজ্ঞানের শিক্ষক উম্মে নাফসুন জানান, পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এটি বংশবিস্তার করে আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ বাঘমারা বিলে পদ্মের ফিরে আসা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই এখানে তৈরি হয়েছে তার নতুন আবাস।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্ত বলেন, পাখির মাধ্যমে পদ্মের বীজ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সেই বীজ থেকে গাছ জন্মায় এবং ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয় পুরো বিলে।

চলনবিল শুধু একটি বিল নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্যের এক দীর্ঘ ইতিহাস। অধ্যক্ষ এম এ হামিদের ‘চলনবিলের ইতিকথা’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। ১৯০৯ সালের এক জরিপে তা কমে দাঁড়ায় ১৪২ বর্গমাইলের। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের জলমগ্ন এলাকা থাকে প্রায় ৮৫ বর্গকিলোমিটার।

চলনবিল অঞ্চলে বিভিন্ন নামে রয়েছে ৩৯টি বিল, যার মোট আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর। একসময় এসব বিলে মিলত পদ্ম, শাপলা, মাখনা, সিঙ্গট, গেচু, চেচুয়া, ভাতসোলাসহ অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ। ছিল বিভিন্ন প্রজাতির ফার্ন, মস ও শৈবাল। কালের পরিক্রমায় বদলেছে বিলের প্রকৃতি, হারিয়ে গেছে অনেক উদ্ভিদ, কিছু প্রজাতি এখন বিপন্ন। সেই বাস্তবতায় বাঘমারা বিলে পদ্মের ফিরে আসা কেবল একটি ফুল ফোটার ঘটনা নয়; এটি যেন হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির বুক থেকে জেগে ওঠা আশার আলো।

বিলে ফুটে থাকা গোলাপি পদ্মের মাঝে ভেসে চলেছে ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা। ছবি : এশিয়া পোস্ট
বিলে ফুটে থাকা গোলাপি পদ্মের মাঝে ভেসে চলেছে ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

তবে পদ্মের সৌন্দর্যের টানে দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সৌন্দর্য দেখতে এসে কেউ কেউ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তা নষ্ট করছেন; ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছেন পদ্মফুল। ফলে এক মুহূর্তের আনন্দের জন্য অন্য দর্শনার্থীদের ফুল দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

পদ্মবিলে ঘুরতে আসা মাহাতোদের কুড়মালি ভাষার লেখক উজ্জ্বল কুমার মাহাতো বলেন, অনেক দিন ধরেই বাঘমারা বিলের পদ্মের কথা শুনছিলাম। অবশেষে নিজের চোখে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তবে মানুষের নির্বিচারে ফুল তোলার দৃশ্য দেখে কষ্ট পেয়েছি। প্রকৃতির সৌন্দর্য সবার জন্য; তাই ফুল না তুলে দূর থেকেই তা উপভোগ করা উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, তারা নিজেদের সাধ্যমতো পদ্মফুল রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু দর্শনার্থীদের ফুল তোলা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে তা