কুষ্টিয়ায় ৩০ পরিবারে চিরকুটে চাঁদা দাবি, পরিচয় ঘিরে উদ্বেগ-রহস্য

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অন্তত ৩০টি পরিবারের কাছে চাঁদা দাবি ঘিরে উদ্বেগ ও রহস্য দেখা দিয়েছে। ‘পূর্ব বাংলা’ পরিচয়ে দেওয়া চিরকুটে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে সময়সীমা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাঁদা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব তথ্য জানিয়ে কয়েকটি পরিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারস্থ হয়েছে। উৎকণ্ঠা জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সরেজমিন কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে পাঠানো চিরকুট ও থানায় করা জিডির অনুলিপি বিশ্লেষণ করেছে এশিয়া পোস্ট। এতে দেখা যায়, গত দুই মাসে কুর্শা, ইশেলমারী, পুটিমারী ও ভেদামারী গ্রামের অন্তত ৩০টি পরিবারের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। চিরকুটগুলোতে আলাদা আলাদা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ভিন্ন অঙ্কের চাঁদা চাওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টাকা পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট বিকাশ এজেন্টের নম্বরও উল্লেখ করা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, চিরকুট পাওয়ার পর অনেকে নিজের বসতঘর ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পুটিমারা গ্রামের এমন একটি পরিবারের ঘর প্রায় দুই মাস ধরে তালাবদ্ধ। দুই মাস আগে ওই বাড়ির দরজায় একটি চিরকুট পাওয়া যায়। চিরকুটে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়।
চিরকুট পেয়েছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, চিরকুট পাওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছি। কারা এই চিরকুট দিচ্ছে, সেটা দ্রুত বের করা দরকার।
আরেকজন বলেন, টাকা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েঠে। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেকে বাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, চাঁদা দাবির ঘটনায় থানায় বেশ কিছু সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। পুলিশ সবগুলো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বাসিন্দাদের ভয় দূর করতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
চিরকুটে কী লেখা
বিভিন্ন পরিবারে দেওয়া কয়েকটি চিরকুট এশিয়া পোস্টের কাছে এসেছে। এর মধ্যে একটি চিরকুটে লেখা আছে, “কুষ্টিয়ার মধ্যে কে কোথায় থাকে, সব কিছু আমাদের জানা। কেন, কী জন্য চাঁদা নেওয়া হচ্ছে, তাও জানা আছে।” এরপর নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম, টাকার অঙ্ক, বিকাশ নম্বর, টাকা দেওয়ার স্থান উল্লেখ করা রয়েছে।
আরেকটিতে লেখা–“সালাম নিন, আশা করি ভালো আছেন। পূর্ব বাংলা পার্টির পক্ষ থেকে নিম্ন নামধারী পরিবারের কাছ থেকে ৫০০০ করে টাকা দিতে হবে। (এরপরে ১২ জনের নামের তালিকা দেওয়া রয়েছে) দুদিনের মধ্যে আনোয়ার কাছে দিয়ে দেবেন, আমরা নিয়ে নেব।” নিচে লেখা রয়েছে, ইতি জীবন/জাহান।

একটি চিরকুটে এক বিকাশ দোকানদারের কাছে টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, “আহসান বিকাশ দোকানদার, পুটিমারা দোকানের কাছে টাকা দেবে। পার্টি যোগাযোগ করে নেবে।” শেষে লেখা–ইতি পূর্ব বাংলা, চুয়াডাঙ্গা।
আরেকটি চিরকুটে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে বলা হয়েছে, “এক বছর আগে মারধর ও মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে এক তরুণের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে।” ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা দিতে বলা হয়। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়। চিঠির শেষে লেখা, পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে, আল মামুন রাজ, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল।
কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের নাম ও ঠিকানা সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য দেওয়া হয়েছে; যা দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কারা এসব চিঠি দিচ্ছে, তারা এলাকায় ঘোরাফেরা করছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
কারা দিচ্ছে চিরকুট
চিরকুট পাওয়ার বিষয় জানিয়ে গত ৪ জুলাই নিরাপত্তা চেয়ে মিরপুর থানায় জিডি করেন মো. মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, জগলুর করিমের মাধ্যমে তিনি দুই পাতার একটি চিরকুটের বিষয়ে জানতে পারেন। ওই চিরকুটে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা পূর্ববাংলা পার্টির নাম ব্যবহার করে রহিমা খাতুনের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং তা না দিলে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
মিজানুর রহমান জিডিতে আরও উল্লেখ করেন ইব্রাহিম নামের আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। চিরকুটের মাধ্যমে দেওয়া হুমকির কারণে নিজের ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে মিজানুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, গ্রামের সব লোককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি একটা জিডি করেছিলাম। আমরা গ্রামের প্রধান মিলে সবাই সজাগ রয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্ত করছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পূর্ব বাংলা নামে কোনো সংগঠন আছে কি না, আমাদের জানা নেই। তবে এক সময় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট নামে ছিল, বর্তমানে সেগুলো নেই।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে কুষ্টিয়ায় ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি’ (লাল পতাকা) নামে চরমপন্থি সংগঠনের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) অপতৎপরতা ছিল। তবে এসব চিরকুট কোনো চরমপন্থি সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে, না কি তাদের নাম ব্যবহার করে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজির চেষ্টা করছে–সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
তারা বলছেন, একের পর এক চিরকুট, নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম-ঠিকানা, টাকার অঙ্ক এবং টাকা দেওয়ার স্থান বা বিকাশ নম্বর উল্লেখের ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারা এত তথ্য সংগ্রহ করছে। পেছনে কোনো চরমপন্থি সংগঠন রয়েছে, না কি ভয়কে পুঁজি করে সক্রিয় হয়েছে নতুন কোনো চাঁদাবাজ চক্র–এসব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি এ উপদলের (পূর্ব বাংলা) কথা শুনেছি। কিন্তু আদৌ অস্তিত্ব আছে কি না এটা বলতে পারব না। ৯০’র দশকের দিকে শুনেছি। এখন শোনা যায় না। নানা নামে নানাভাবে চাঁদাবাজি… এটা পরিবর্তন হয়ে গেছে।
এ ধরনের চাঁদা দাবির সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং চিরকুটগুলোর উৎস, লেখক এবং এর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (ওসি) আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা অভিযান চালিয়েছি। ঘটনা উদঘাটনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।


