logo

পুলিশ ফাঁড়িতে স্কুলছাত্রীর হারপিক পান, মৃত্যুর পর ভিডিও ঘিরে চাঞ্চল্য

পুলিশ ফাঁড়িতে স্কুলছাত্রীর হারপিক পান, মৃত্যুর পর ভিডিও ঘিরে চাঞ্চল্য
মধুখালী থানা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফরিদপুরের মধুখালীর নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মিথিলা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় তৈরি হয়েছে তীব্র রহস্য ও ক্ষোভ। স্কুলে যাওয়ার পথে অপহরণের পর দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ও পুলিশ ফাঁড়িতে হারপিক পানের দীর্ঘ দেড় মাস পর নিজ বাড়িতেই প্রাণ হারিয়েছে ওই কিশোরী। সম্প্রতি মৃত্যুর আগে ধারণ করা মিথিলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

একদিকে পরিবার থানা-পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার ও হয়রানির অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। দুই থানার দায়িত্বশীলদের বক্তব্য এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।

মিথিলা আক্তার মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের আ. হান্নানের মেয়ে। তিনি স্থানীয় কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।

পরিবারের অভিযোগ, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক থেকে মোটরসাইকেলে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয় মিথিলাকে। পরে পার্শ্ববর্তী মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে গিয়ে রাফি শেখ (২১), রাহুল শেখ (২০) ও সায়মন বিশ্বাস (২০) তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় সোহাগ শেখ (২০) নামে আরও একজন সহযোগিতা করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে পালিয়ে মধুমতি নদীতে ঝাঁপ দেন মিথিলা। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে হারপিক পান করেন তিনি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফিরলেও শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতে মৃত্যু হয় মিথিলার। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন মিথিলা। ভিডিওতে তাকে মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়া এবং অভিযুক্তদের বিষয়ে বলতে শোনা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মিথিলার বাবা আ. হান্নান শেখ অভিযোগ করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার মেয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে রাফি, রাহুল ও সায়মন তাকে জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। পরে মাগুরার শ্রীপুরের মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ঘটনার পর মেয়েটি মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর শেষ পর্যন্ত তাকে হারাতে হলো। আমরা মেয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চাই। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

অন্যদিকে মিথিলার মা জেসমিন খাতুনের অভিযোগ, ঘটনার পর পুলিশ তাদের থানায় ডেকে নেয়। পরে শ্রীপুর থানায় পাঠানো হলে সেখানে মামলা না নিয়ে একটি সাদা কাগজে জোরপূর্বক স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মিথিলার ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখ বলেন, আমার শ্যালিকাকে তুলে নেওয়ার প্রায় তিন মাস আগে পারিবারিক সিদ্ধান্তে অন্য জায়গায় তার বিয়ের কাবিন হয়েছিল। এতে তার এক মামাতো ভাই ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ, সে মিথিলাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। আমাদের ধারণা, সেই বিরোধ থেকেই পরিকল্পনা করে রাফির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর পরিবারের কাছে নির্যাতনের বিষয়টি জানিয়েছিল। তবে নতুন করে বিয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তখন তারা বিষয়টি প্রকাশ করেননি। এখন মেয়েটি মারা যাওয়ায় অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান তারা।

তবে পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে শ্রীপুর থানা পুলিশ। শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, ‘রাফি শেখের সঙ্গে মিথিলার প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। এর মধ্যে মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হয়। এ ঘটনার জের ধরে ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় দুজনের দেখা হয়। তারা সেখানে দীর্ঘ সময় গল্প করে। একপর্যায়ে মিথিলা নদীতে ঝাঁপ দেয়। ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি বিষয়টি দেখে স্থানীয়দের জানান। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে।’

ওসি আরও বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছি। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘাটটি ফাঁকা জায়গা, আশপাশে মানুষের যাতায়াত রয়েছে এবং সেখানে সার্বক্ষণিক মাঝি থাকেন। তারা কেউ এমন কোনো ঘটনা দেখেননি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

তিনি দাবি করেন, উদ্ধারের সময় কিংবা পরবর্তী দেড় মাসে মিথিলা বা তার পরিবারের কেউ পুলিশকে ধর্ষণের অভিযোগ জানাননি। মৃত্যুর পর ভিডিও প্রকাশের বিষয়টিও তাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে। তার ভাষ্য, মিথিলাকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার পর ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সে হারপিক পান করে।

অন্যদিকে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় এশিয়া পোস্ট কে বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পর আমরা শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করি। সেখান থেকে পরিবারকে পাঠানোর কথা বলা হয়। পরে তারা শ্রীপুর থানায় গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে জানতে পারি, মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দেড় মাস আগের ঘটনাটি আমাদের কেউ জানায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার মিথিলার বাবা আ. হান্নান চারজনকে আসামি করে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে মৃত্যুর আগে দেওয়া ভিডিও, পরিবারের নির্যাতনের অভিযোগ, পুলিশের তদন্তের বক্তব্য এবং দুই থানার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে মিথিলার মৃত্যুর ঘটনায় একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। এখন পরিবারের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক।