logo

সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড: গিয়েছিলেন ৭ লাখ টাকা ঋণে, আরও যে তথ্য দিলেন মা

সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড: গিয়েছিলেন ৭ লাখ টাকা ঋণে, আরও যে তথ্য দিলেন মা
সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড নজরুলের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামের বাড়ি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সৌদি আরবের মক্কায় প্রবাসী যুবক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে শোক কাটছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামে নিহতের পরিবারের। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ লাখ টাকা ঋণ করে ছেলেকে সৌদি আরব পাঠিয়েছিলেন অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু সৌদি যাওয়ার ৩ মাসের মধ্যেই কারাবন্দি হন নজরুল।

তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে কিছুই জানানো হয়নি বলে দাবি তাদের। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছেন নজরুলের মা-বাবা। এদিকে সৌদিতে নজরুলের মৃতুদণ্ডের শুনে একই দিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার ফুফু আবেদা বেগম।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান নজরুল ইসলাম (২০)। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। নজরুলের গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারলেও কী অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল, তা তখন জানতে পারেনি বলে দাবি স্বজনদের।

নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি। বুধবার গণমাধ্যমে খবর দেখে ছেলের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারেন তারা।

নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে কী কারণে জেলে ছিল, তা আমি এখনও জানি না। হঠাৎ ফেসবুকে তার মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পেলাম। নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে তার ফুফু আবেদা বেগম বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেকে সাত লাখ টাকা ঋণ করে পরিবারের হাল ধরতে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। যাওয়ার ছয় মাস পর থেকেই সে জেলে ছিল। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ঋণদাতারাও আমাকে চাপ দিচ্ছেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলেকে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে, এর বিচার আমি চাই।’

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও স্থানীয় বাসিন্দা গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, ‘নজরুলকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো অপরাধ সে করেছে বলে মনে করছি না। সরকারের কাছে আবেদন, ওই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উদ্‌ঘাটন করা হোক। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা যদি যোগাযোগ করত, তাহলে এই পরিস্থিতি হতো না। কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের এমন সাজা হয়েছিল, কিন্তু তাদের দেশের দূতাবাস ব্যবস্থা নিয়ে ওই নাগরিককে দেশে নিয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত নজরুলের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি কেউ।’

গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিনও নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এমন শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ বলেন, ‘তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুজন নাগরিক এভাবে কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি জানত না—এটা কীভাবে সম্ভব? তাদের মূল কাজ কী, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু এই বিচার নয়, সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে অমানবিক নির্যাতনের খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ঘটনা বন্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শুনিনি।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে, যেহেতু তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা, নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।’