
পাহাড়ের বুকে শিক্ষার আলো জ্বেলে চলা রাঙামাটি জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা সমতলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। জেলায় সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ৭৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ১৪৯টি বেসরকারি বিদ্যালয় আজও অবহেলিত ও নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি চাষাবাদ, টিউশনি কিংবা অন্যান্য পেশায় অর্জিত আয় দিয়ে কোনোমতে সংসার ও স্কুল টিকিয়ে রেখেছেন তারা। রাঙামাটির শিক্ষা খাতের এই চিত্র যেন চিরচেনা প্রবচন ‘বাতির নিচেই অন্ধকার’-এর বাস্তব রূপ।
রাঙামাটি পৌরসভার একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ‘সিলেটি পাড়া’। প্রায় ২০০ পরিবারের এই জনপদে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। ফলে ২৪ বছর ধরে হতদরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ‘রাগীব রাবেয়া ফুল কুঁড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। দুই কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো প্রাথমিকে পড়ার সুযোগ না থাকায় এই প্রতিষ্ঠানটিই এলাকার একমাত্র ভরসা।
দুই শিফটের এই বিদ্যালয়ে তিনজন সহকারী ও একজন প্রধান শিক্ষক নামমাত্র সম্মানিতে পাঠদান করছেন। ২০২২ সালে দেশের বেশকিছু বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও বাদ পড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। ফলে উপযুক্ত স্বীকৃতি ও আর্থিক নিরাপত্তা না পেয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে তাদের।
জেলার অপর ১৪৯টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গল্পও প্রায় একই রকম। রাঙামাটি সদরের বসন্ত নিচু পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রমোদ চাকমা। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা বা উপবৃত্তি পায় না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে জেলা পরিষদ প্রদত্ত দেড় হাজার টাকার সম্মানিও বন্ধ রয়েছে। নিজের সন্তানদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাব, নাকি স্কুল টিকিয়ে রাখব বুঝতে পারছি না। সরকার নজর না দিলে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
একই রকম কষ্টের কথা শোনালেন নানিয়ারচর জুমিয়া পুনর্বাসন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণময় তালুকদার। তিনি জানান, পাঁচজন শিক্ষক পালাক্রমে ক্লাস নেন। জেলা পরিষদের অনুদান বন্ধ থাকায় পরীক্ষার খরচসহ বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা তাদের নিজেদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। সংসার চালাতে এখন বাধ্য হয়ে বাড়ির পতিত জমিতে চাষাবাদ করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বাঘাইছড়ির অদ্বিতি কেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহাদাৎ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিদ্যালয়টি সেনাবাহিনী পরিচালিত হওয়ায় কিছু ভাতা পাওয়া যায়। তা না হলে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়তে হতো। বাকি সময় টিউশনি করে জীবনসংগ্রাম চালিয়ে নিচ্ছি।
একই উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম ও পশ্চাৎপদ এলাকায় অবস্থিত ত্রিপুরাছড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ জন শিক্ষার্থী ও ৫ জন শিক্ষকের এই বিদ্যালয়ে কোনো বেতন-ভাতা নেই। প্রধান শিক্ষক ছোটন চাকমা এশিয়া পোস্টকে জানান, সুবিধাবঞ্চিত ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে শিক্ষকরা বছরের পর বছর বিনা বেতনে কাজ করছেন।
তিনি আরও জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদ সচিবালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণের সুপারিশ করা হলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর শিক্ষাসেবা নিশ্চিত করতে এসব বিদ্যালয় এবং কর্মরত শিক্ষকদের দ্রুত জাতীয়করণ করা অত্যন্ত জরুরি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, দুই দফায় জেলার ৮১টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও ১৪৯টি বিদ্যালয় এখনো বেসরকারি রয়ে গেছে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ই স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ও অনুদানে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০টি বিদ্যালয় জেলা পরিষদের মাধ্যমে সামান্য কিছু সম্মানি পেত, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. কফিল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়গুলো বিনামূল্যে পাঠ্যবই পেলেও সরকারি অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা পায় না। সরকারিভাবে জাতীয়করণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে তথ্য চাওয়া হলে তা পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সায়রা চন্দ্রা চাকমা এশিয়া পোস্টকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষকদের সম্মানী বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন স্কিমের মাধ্যমে শিক্ষকদের সম্মানি চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ রাখছি। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোকে নতুন করে জাতীয়করণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ধাপে ধাপে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।
