প্রযুক্তির দাপটে ম্লান ৪৫ বছরের পুরোনো পেশা

একসময় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর বাজারের পরিচিত মুখ ছিলেন শ্রীদাম বর্মণ (৬০)। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটত কাপড় ইস্ত্রি ও ধোলাইয়ের কাজে। শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবিসহ হরেক রকমের কাপড় নিয়ে তার ছোট লন্ড্রি দোকানে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকত। বিশেষ করে ছুটির দিন শুক্রবারে জমা হতো কাপড়ের স্তূপ। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই চেনা চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত শ্রীদাম বর্মণ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাহিরপুর বাজারে লন্ড্রির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। চার দশকের বেশি সময় ধরে একই পেশায় থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। শ্রীদাম বর্মণ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মধ্য তাহিরপুর গ্রামের মৃত উপেন্দ্র বর্মণের ছেলে।
অতীতের স্মৃতিচারণা করে শ্রীদাম বর্মণ বলেন, প্রায় ৪৫ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে আছি। একসময় শার্ট-প্যান্টসহ বিভিন্ন কাপড় মাত্র ৫০ পয়সায় ইস্ত্রি ও ধোলাই করতাম। তখন সংসারও ভালোভাবে চলত। এখন কাপড়প্রতি ইস্ত্রি ১০ টাকা আর ধোলাই ৫০ টাকা পেয়েও ঠিকমতো সংসার চালানো যাচ্ছে না। দুই ছেলেকে নিয়ে টেনেটুনে দিন পার করছি।
কাজের পরিধি কমে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আগে শুক্রবার এলেই দোকানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। এখন ঘরে ঘরে ইলেকট্রিক ইস্ত্রি এসে গেছে। ফলে দোকানে আর আগের মতো মানুষ আসে না, ছুটির দিনেও এখন দোকান ফাঁকা থাকে।
দীর্ঘদিনের পেশা আঁকড়ে রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এত বছর ধরে এ কাজ করছি, ব্যবসাটার ওপর মায়া পড়ে গেছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও ছাড়তে পারি না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে কাপড় ইস্ত্রি ও ধোলাইয়ের জন্য বাজারের লন্ড্রিগুলোর ওপরই মানুষের মূল নির্ভরতা ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ ও আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে অধিকাংশ ঘরেই এখন ইলেকট্রিক ইস্ত্রি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে শ্রীদামের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপার্জন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই শ্রীদাম বাবুকে এই কাজ করতে দেখছি। আগে তার দোকানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত, শুক্রবারে হতো কাপড়ের পাহাড়। এখন সময় বদলে যাওয়ায় মানুষ আর লন্ড্রিমুখী হয় না।
তাহিরপুর বাজারের ব্যবসায়ী মজনু মিয়া বলেন, শ্রীদাম দীর্ঘ দিন ধরে সততার সঙ্গে কাজ করছেন। একসময় এই আয়েই তার সংসার চলত। এখন আয় কমে যাওয়ায় কষ্টে দিন কাটছে। এমন পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রবীণ গণমাধ্যমকর্মী রমেন্দ্র নারায়ণ বৈশাখ বলেন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে শ্রীদামের মতো ক্ষুদ্র ও পুরোনো ব্যবসায়ীরা আজ অস্তিত্বসংকটে। যে পেশা একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল, কালের বিবর্তনে তা এখন টিকে থাকার সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
পেশার প্রতি ভালোবাসা আর মায়া নিয়ে এখনো প্রতিদিন তাহিরপুর বাজারে দোকানে বসেন শ্রীদাম বর্মণ। ইস্ত্রি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করেন গ্রাহকের—যদি কেউ আবার পুরোনো দিনের মতো কাপড়ের স্তূপ নিয়ে এসে দাঁড়ায়!


