logo

নোংরা-ব্যবহার অনুপযোগী যাত্রীছাউনি, ভাড়ায় চলছে দোকান

নোংরা-ব্যবহার অনুপযোগী যাত্রীছাউনি, ভাড়ায় চলছে দোকান
যাত্রী ছাউনি দখল করে গড়ে উঠেছে দোকান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রোদ-বৃষ্টি থেকে যাত্রীদের সুরক্ষা দিতে নির্মাণ করা হয়েছিল যাত্রীছাউনি। অথচ বাগেরহাট শহরের অনেক ছাউনিতে এখন সেই সুরক্ষার চিহ্নই নেই। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ফুটো টিন দিয়ে পানি পড়ছে; আবার কোথাও ভেঙে পড়েছে বসার জায়গা। এর মধ্যেই কোনো কোনো ছাউনি দখল করে গড়ে উঠেছে মোটরসাইকেল-রিকশার গ্যারেজ, চায়ের দোকানসহ নানা স্থাপনা। পোস্টার-ব্যানারে ঢেকে থাকা কিছু ছাউনিকে দূর থেকে দেখলে বোঝারও উপায় নেই, এগুলো যাত্রীদের অপেক্ষার জায়গা নাকি দোকান।

শুধু বসার জায়গার সংকটই নয়, যাত্রীছাউনিগুলোতে নেই পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী যাত্রীরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহরে আসা নারীদের জরুরি প্রয়োজনে পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। বৃষ্টি কিংবা তীব্র রোদে দাঁড়ানোর মতো জায়গা না পেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে।

এক নারী যাত্রী আসমা বলেন, আমরা গ্রাম থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরে আসি। অনেক সময় যানবাহনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু যাত্রী ছাউনিতে বসার ভালো ব্যবস্থা নেই। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে নারীদের জন্য শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। জরুরি প্রয়োজনে কোথায় যাব, তা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। যাত্রীছাউনিগুলো সংস্কারের পাশাপাশি নারীদের জন্য শৌচাগারের ব্যবস্থা করা জরুরি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডের যাত্রীছাউনিটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ছাউনির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। বসার জায়গারও বেহাল দশা। বৃষ্টি হলে টিনের ছাউনির বিভিন্ন অংশ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। পানি ঠেকাতে ছাউনির ওপরে কাগজ ও পলিথিন দিয়ে কোনোমতে ঢেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাতেও পুরোপুরি পানি আটকানো সম্ভব হয় না। ফলে বৃষ্টির সময় যাত্রীদের আশ্রয় নেওয়ার কথা থাকলেও উল্টো ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

শুধু তাই নয়, যাত্রীছাউনির ভেতরে ও আশপাশে রয়েছে মোটরসাইকেল ও রিকশার গ্যারেজ এবং চায়ের দোকান। যাত্রীদের বসার জন্য নির্মিত জায়গার একটি অংশ এভাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকছে না। কোনো কোনো ছাউনিতে দোকান পরিচালনার জন্য প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নতুন জেলা কারাগারের সামনের যাত্রীছাউনিটির অবস্থাও শোচনীয়। ছাউনির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও বসার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও আবার ছাদের অবস্থাও ভালো না। দশানী পুলিশ বক্সের পাশের যাত্রীছাউনিটির অবস্থাও ভালো নয়। ছাউনির দুই পাশে গড়ে উঠেছে দোকান। ভেতরে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির বসবাসের কারণে যাত্রীদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা ছাউনিটি যাত্রীদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।

শহরের অন্যান্য যাত্রীছাউনির চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। কোনো কোনো ছাউনিতে যাত্রীদের বসার জায়গায় তৈরি হয়েছে ছোট ছোট দোকান। আবার কোথাও পোস্টার ও ব্যানার দিয়ে ছাউনির দেয়াল এমনভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে যে দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এটি যাত্রী ছাউনি নাকি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নির্মিত স্থাপনায় এমন দৃশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে খানজাহান আলী মাজার এলাকায় সম্প্রতি নির্মিত যাত্রীছাউনিটির অবস্থাও হতাশাজনক। সেখানে দেয়ালে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে, ‘দয়া করে কেউ যাত্রীছাউনির ভেতরে পানের পিক ফেলবেন না। পানের পিক ফেললেই ১০০ টাকা জরিমানা।’ কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, সতর্কবার্তার ঠিক নিচেই দেয়ালে পানের পিক ফেলে নোংরা করে রাখা হয়েছে। দেয়ালের সাদা অংশজুড়ে পানের পিকের দাগ দেখে মনে হয়, যেন কেউ সেখানে রং করে রেখেছে।

নতুন নির্মিত যাত্রীছাউনিতেও এমন চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, শুধু স্থাপনা নির্মাণ করলেই হবে না, এর পরিচ্ছন্নতা, ব্যবহার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

যাত্রী ছাউনিগুলোর এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—যাত্রীদের আশ্রয়ের জন্য নির্মিত এসব স্থাপনার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না? কোথাও দোকান, কোথাও গ্যারেজ, আবার কোথাও নানা ধরনের সামগ্রী রাখার কারণে প্রকৃত যাত্রীরা কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি নারী যাত্রীদের জন্য শৌচাগার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় জনসেবামূলক এসব স্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলম মোল্লা বলেন, বাগেরহাটের ট্রাফিক মোড় খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এখানকার যাত্রী ছাউনিটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অনতিবিলম্বে বাগেরহাটে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যাত্রীছাউনিটি সংস্কারের ব্যবস্থা করুন।

জাকির বলেন, আমাদের বাসস্ট্যান্ডের যাত্রীছাউনিটি ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। এ বিষয়ে আমরা অনেকবার অভিযোগ জানিয়েছি। তারপরও এটি মেরামত করা হয়নি। যাতায়াতের সময় আমাদের খুব সমস্যা হচ্ছে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ দ্রুত এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেবে।

সাবু সরদার বলেন, এটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। গ্রামগঞ্জ থেকে আসা অনেক মা-বোন এখানে রোদ-বৃষ্টিতে বসতে পারেন না। এতে যাত্রীদের অনেক কষ্ট হয়। সরকার যদি যাত্রীছাউনিটি সংস্কার করে দিত, তাহলে সাধারণ মানুষের অনেক সুবিধা হতো।

এদিকে যাত্রী ছাউনিতে গড়ে ওঠা দোকানগুলো ঘিরেও রয়েছে নানা অভিযোগ। কয়েকজন দোকানদার জানান, সেখানে ব্যবসা করতে গিয়ে তাদের নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেক সময় তারা প্রতিবাদও করতে পারেন না।

দোকানদার তহুরা বেগম বলেন, দোকানের মালামাল আমি নিজের টাকায় কিনে আনি। কিন্তু অনেকেই বাকিতে সিগারেট, পানসহ বিভিন্ন জিনিস নিয়ে টাকা পরিশোধ করেন না। কেউ ৫০ টাকা, কেউ ১০০ টাকা নিয়ে আর ফেরত দেন না। নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা কিছু বলতে পারি না। মা-মেয়ে মিলে দোকান চালাই। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে পারি না।

আরেক দোকানদার শান্তা ইসলাম লিজা বলেন, এই যাত্রী ছাউনিতে দোকান করতে ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হবে বলে জানিয়েছে। মাঝেমধ্যে কিছু লোক এসে সিগারেট খেয়ে টাকা দেন না। আবার ৫০ বা ১০০ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে দোকান করতে দেবেন না বলে হুমকি দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, আমি ভাড়া দিয়ে এখানে দোকানদারি করি। ছোট্ট এই দোকানের জন্য প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এ ছাড়া দোকানের পজিশন নিতে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। যতদূর জানি, জেলা পরিষদ থেকে একজন দোকানগুলো বরাদ্দ নিয়েছি তিনিই আমাদের কাছে ভাড়া দেন।

দোকানদারদের এসব বক্তব্যের পর যাত্রীছাউনিতে দোকান পরিচালনা, ভাড়া আদায় এবং জায়গা ব্যবহারের অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব দোকান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কার অনুমোদনে চলছে এবং ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা কী—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার বক্তব্য প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এই বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যে অবগত হয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জরাজীর্ণ যাত্রী ছাউনিগুলো দ্রুত সংস্কার করা হবে। পৌরসভার মধ্যে কোনো যাত্রী ছাউনিতে দোকান বা অন্য কোনো স্থাপনা থাকলে সেগুলো সরিয়ে যাত্রীদের বসার উপযোগী করা হবে। সাধারণ যাত্রীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে এসব ছাউনি ব্যবহার করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।