logo

নদীর বুকে হাট, নৌকায় নৌকায় বিক্রি হয় কোটি টাকার কৃষিপণ্য

নাছরুল্লাহ আল-কাফী
পিরোজপুর
নদীর বুকে হাট, নৌকায় নৌকায় বিক্রি হয় কোটি টাকার কৃষিপণ্য
বেলুয়া নদীর বুকে বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে কৃষিপণ্যবোঝাই নৌকা নিয়ে কেনাবেচায় ব্যস্ত ক্রেতা-বিক্রেতারা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ভোরের আলো ফুটতেই বাংলার ভেনিসখ্যাত ভাসমান হাটে বেলুয়া নদীর বুকে ভিড়তে শুরু করে একের পর এক কৃষিপণ্যবোঝাই নৌকা। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় ধান-চাল, আবার কোনো নৌকায় আখসহ নানা কৃষিপণ্য। একেকটি নৌকা যেন হয়ে ওঠে একেকটি ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম ও কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকে গড়ে ওঠে জমজমাট এক বাজার।

ভাসমান এ বাজার বসে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে। সপ্তাহে দুই দিন বসে ব্যতিক্রমী এ হাট। জলকেন্দ্রিক বাজার ও নদী-নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনের মিল খুঁজে পান স্থানীয়রা। এ কারণে বৈঠাকাটা বাজারকে কেউ কেউ ‘বাংলার ভেনিস’ বলেন।

দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় ভাসমান বাজার হিসেবে পরিচিত বৈঠাকাটা বাজারটি পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মানুষের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নাজিরপুর উপজেলার অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে এ বাজার।

নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বাজারে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে আসেন।

শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কেনাবেচা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। দ্রুতই চলে বেচাকেনা। তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে কেনাবেচা শেষ করে বেলা ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা ফিরে যেতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে নদীর বুক।

নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নৌকায় করে নিয়ে আসেন এ হাটে। একইভাবে নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, গগন, মলুহার, কাঁটাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরাও এখানে পণ্য বিক্রি করেন।

এ ভাসমান বাজারে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা, সবজির চারা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ব্যাপক সমারোহ ঘটে। কাকডাকা ভোরে ডিঙি নৌকায় কৃষিপণ্যের পসরা সাজিয়ে বাজারে আসেন কৃষকেরা। একই সময়ে ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও জড়ো হন।

শুধু কৃষিপণ্য নয়, বাজারটিতে রয়েছে ভাসমান চায়ের দোকান, পিঠা ও বিভিন্ন খাবারের দোকানও। নৌকাতেই এসব দোকানের পসরা সাজিয়ে বিক্রি করেন বিক্রেতারা। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদী পরিণত হয় মানুষের কোলাহল ও বেচাকেনায় মুখর এক ব্যতিক্রমী বাজারে।

বৈঠাকাটা বাজারে স্থানীয় কৃষকের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাইকাররা আসেন। তারা কৃষিপণ্য কিনে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা বাজারে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানকার কৃষিপণ্যের একটি অংশ দেশের বাইরেও যায়।

এ বাজারের অন্যতম বিশেষ দিক হলো ভাসমান কৃষির উপকরণের বেচাকেনা। বেলুয়া নদীতে শুধু শাকসবজি বা ফলমূল নয়, বিক্রি হয় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছাও। এসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করে শীতকালীন সবজি ও সবজির চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা।

বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে কৃষিপণ্যবোঝাই শত শত নৌকার সমাগম। ছবি : এশিয়া পোস্ট
বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে কৃষিপণ্যবোঝাই শত শত নৌকার সমাগম। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেডে সবজি চাষের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা, ফেনাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব ভাসমান বেড।

বৈঠাকাটা বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাও। দেশের বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। নদীর বুকজুড়ে শত শত নৌকা, কৃষিপণ্যের বেচাকেনা, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারকে ঘিরে ভেলা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও হয়েছে। এতে বাজার ও নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ফলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিনোদনের সঙ্গেও এ বাজারের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তবে মৌসুমভেদে বাজারের চিত্র বদলে যায়। বিশেষ করে তরমুজের মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে দেখা যায় তরমুজবোঝাই নৌকার সারি। তখন প্রতি হাটে কেনাবেচার পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী আলম তালুকদার বলেন, আমি গ্রাম থেকে মাল কিনে এনে এখানে বিক্রি করি। বেশিরভাগ সময় কাঁকরোল বিক্রি করি। এই বাজারে বেচাকেনা ভালো হয়, দামও ভালো পাই। এখানকার আয় দিয়েই পরিবার ভালোভাবে চালাচ্ছি।

আরেক ব্যবসায়ী আলী আজগর বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। এই বাজারের প্রধান পণ্য কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ। সব মিলিয়ে ভালো বেচাকেনা হয়। তরমুজের মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বেচাকেনা হয়। বর্তমানে এই বাজারে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়।

বৈঠাকাটা বাজারে জলজ উদ্ভিদ বিক্রি করতে আসা ইব্রাহিম বলেন, আমি এ বাজারে দুলালিলতা নিয়ে আসি। বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। ভালো দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, বাজার খারাপ গেলে পাঁচ হাজার টাকার মতো হয়।

দুলালিলতা ও শ্যাওলা কিনতে আসা মিনহাজ নামে এক ক্রেতা বলেন, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা ও দুলালিলতা কিনতে বাজারে এসেছি। এগুলো দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করা হয়।

এ অঞ্চলে পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান ধাপ তৈরি করে কৃষকেরা সবজি ও চারা উৎপাদন করেন। পরে নৌপথে এসব পণ্য পৌঁছে যায় বৈঠাকাটা বাজারে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেকটা নদী ও নৌকাকেন্দ্রিক।

বাজারটি ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। স্থানীয়দের ধারণা, বাজারটির বয়স এক শতাব্দীর কম নয়।

প্রায় চার দশক ধরে বৈঠাকাটা বাজারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রফিকুল বলেন, ১৯৭১ সালে আমার জন্ম। এর আগে থেকেই এই হাট ছিল। আমার ধারণা, হাটটির বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর হবে।

স্থানীয় এক কৃষক মো. আল আমিন বলেন, যুগ যুগ ধরে এই হাট চলে আসছে। আমার বাবা-দাদার আমল থেকেই এখানে এভাবে বেচাকেনা হতে দেখেছি। এখানে শাকসবজি, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া ও নানা ধরনের কৃষিপণ্য পাওয়া যায়। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এখানে পণ্য কিনতে আসেন।

বাজারের বয়স নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত—দীর্ঘদিন ধরে বৈঠাকাটা বাজার এ অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।

পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুরের বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার ওপর বাজার বসে। সেখানে শাকসবজি, ফলমূল, সবজির চারা এবং চারা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বেচাকেনা হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার খুব ভোরে বাজার বসে। বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও পাইকাররা এসে এসব পণ্য কেনেন। বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়ে থাকে।