
সকালের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বাবুগঞ্জ বাজারে একে একে দোকানের শাটার উঠছে। কেউ পণ্য সাজাচ্ছেন, কেউ দোকানের সামনে ঝাড়ু দিচ্ছেন। ক্রেতাদের আনাগোনাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর মধ্যেই হাতে একটি বস্তা নিয়ে বাজারের এক প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু করেছেন ৭৩ বছর বয়সি হযরত আলী।
কোথাও পড়ে থাকা কাগজ, কোথাও পলিথিন, কোথাও খাবারের প্যাকেট, চোখে পড়লেই একে একে সেগুলো তুলে নিচ্ছেন বস্তায়। বস্তা কিছুটা ভারী হলে নিয়ে যাচ্ছেন বাজারের পাশের নির্ধারিত জায়গায়। ময়লা ফেলে আবার ফিরছেন। তারপর আবার হাঁটা, আবার ময়লা কুড়ানো।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের এই মানুষটি প্রায় ৫০ বছর ধরে বাবুগঞ্জ বাজার পরিষ্কার করছেন। তাকে কেউ নিয়োগ দেয়নি। নেই বেতন, নিয়োগপত্র কিংবা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা। বাজার কমিটির কোনো পদেও তিনি নেই। তবু প্রতিদিন সকালে বস্তা হাতে বাজারে আসেন। নিজের ইচ্ছায় পরিষ্কার করেন রাস্তা, গলি ও দোকানের আশপাশ।
বস্তা হাতে পাঁচ দশক
বাবুগঞ্জ বাজারে প্রায় ২০০টি দোকান। রয়েছে সরকারি মালিকানাধীন একটি বড় দোতলা মার্কেট। বাজারের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে বানার খাল। প্রতিদিন শত শত মানুষের যাতায়াত ও কেনাবেচায় এখানে নানা ধরনের আবর্জনা জমে। প্রায় ৩০০ মিটারজুড়ে বিস্তৃত বাজারের গলি ও রাস্তা দিনের শুরুতেই পরিষ্কার দেখা গেলে, তার পেছনে বড় ভূমিকা থাকে হযরত আলীর।
তবে তার এই কাজের শুরু বাজার দিয়ে নয়। বিশের কোঠায় বয়স থাকতেই পরিচ্ছন্নতার প্রতি তার আলাদা টান তৈরি হয়। নিজের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করতেন। রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকতে দেখলে তুলে ফেলতেন। পরিষ্কার জায়গা তার ভালো লাগত। একসময় সেই অভ্যাস ছড়িয়ে পড়ে বাবুগঞ্জ বাজারে।
এই দীর্ঘ সময়ে বাজারের চেহারা বদলেছে। অনেক দোকান হয়েছে, অনেক দোকান উঠে গেছে। ব্যবসায়ী বদলেছেন, প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু হযরত আলীর হাতে থাকা বস্তাটি বদলায়নি।
সকাল থেকে শুরু হওয়া কাজ কখন শেষ হবে, তার কোনো হিসাব নেই। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার পরও তাকে বাজারে দেখা যায়। কখনো এশার নামাজের আগ পর্যন্ত কাজ করেন। শরীর বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ বসেন বা শুয়ে থাকেন। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার ফিরে আসেন বাজারে।
শরীরও আগের মতো নেই। কিছুটা নুয়ে গেছে। শ্রবণশক্তি কমেছে। রয়েছে আরও কিছু শারীরিক সমস্যা। তবু বস্তা হাতে তার চলা থামেনি। ঝড়-বৃষ্টি হলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। তারপরও শরীর যতক্ষণ সঙ্গ দেয়, ততক্ষণ বাজারে আসেন।
সংসারে অভাব, কাজ থামেনি
হযরত আলীর নিজের সংসারেও অভাব আছে। একমাত্র ছেলে দিনমজুরের কাজ করেন। স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তিন সদস্যের পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক কষ্টের মধ্যেই চলছে।
সংসারে যখন টাকার প্রয়োজন, তখনও হযরত আলী দিনের পর দিন বিনা পারিশ্রমিকে বাজার পরিষ্কার করেন। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের কাছেও একসময় সহজ ছিল না। তারা তাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, এত সময় বিনা পারিশ্রমিকে না দিয়ে অন্য কোনো কাজ করলে সংসারে কিছু আয় হতো। কিন্তু হযরত আলী থামেননি।
কথা হয় তার সঙ্গে। হযরত আলী জানান, মাটিতে পড়ে থাকা আবর্জনা দেখলে তার অস্বস্তি হয়। চোখে পড়লে মনে হয়, সেটি তুলে ফেলতে হবে। এই অভ্যাস থেকেই প্রতিদিন বাজারে আসা।
নিজের এই কাজকে বড় করে দেখেন না তিনি। কোনো স্বীকৃতির আশায়ও করেন না। তার কাছে বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক, ময়লা দেখেছেন, তাই তুলে নিয়েছেন।
বাবুগঞ্জ বাজারের পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে হযরত আলী এখন আর আলাদা কোনো চরিত্র নন। বাজারের সঙ্গে তার উপস্থিতি এমনভাবে মিশে গেছে যে তাকে ছাড়া বাজারের একটি সকাল কল্পনা করাও অনেকের কাছে কঠিন।
পাহাড় অনন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা বয়োবৃদ্ধ ফজলুল মিয়া বলেন, যারা ছোটবেলায় হযরত আলীকে দেখেছেন, তাদের চোখের সামনে তিনি বয়সের ভারে ধীরে ধীরে নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু তার কাজের ধরন বদলায়নি। একসময় যে হাতে শক্তি ছিল, এখন সেই হাত ধীরে চলে। হাঁটার গতি কমেছে। বারবার বিশ্রাম নিতে হয়। তবু বস্তাটি হাতছাড়া করেন না।

ফজলুল মিয়া বলেন, পাঁচ দশক ধরে একই কাজ করে যাওয়া কোনো সাধারণ অভ্যাস নয়। এত বছর ধরে তিনি যে আবর্জনা কুড়িয়েছেন, তার হিসাব নেই। কত বস্তা ময়লা বাজার থেকে সরিয়েছেন, তার হিসাবও নেই। কোনো হাজিরা খাতা নেই, নেই মাস শেষে বেতন পাওয়ার অপেক্ষা। নেই ছুটির আবেদন কিংবা কর্মঘণ্টার হিসাব। আছে শুধু একটি বস্তা আর পরিচ্ছন্নতার প্রতি এক ধরনের টান।
আজিজুল ইসলাম নামের আরেকজন বাসিন্দা বলেন, তিনি ময়লা দেখলে থাকতে পারেন না। অনেক সময় আমরা যে জিনিসটা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই, উনি সেটাই তুলে নেন। বয়স হয়ে গেছে, তবু অভ্যাসটা ছাড়তে পারেননি।
বাজারের ব্যবসায়ী এরশাদুল মিয়া বলেন, হযরত চাচাকে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তখন তিনি অনেক তরুণ ছিলেন। এখন বয়স হয়েছে, শরীর নুয়ে গেছে। কিন্তু হাতে সেই বস্তা। আমরা দোকান খুলে দেখি, সামনের জায়গাটা অনেকটাই পরিষ্কার।
বাবুগঞ্জ বাজার বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি ওবায়দুল ইসলাম চৌধুরী পান্না বলেন, দোকানের সামনে একটা পলিথিন ফেললে, সেটা কুড়িয়ে নিতে ওনার কয়েক সেকেন্ড লাগে। কিন্তু ৫০ বছর ধরে এভাবে প্রতিদিন কাজ করার কথা ভাবলে বিষয়টা অন্য রকম মনে হয়।
নাগরিক সংগঠক অধ্যাপক মাসুম বিল্লাহ বলেন, পাঁচ দশক আগে যে অভ্যাসের শুরু হয়েছিল, বয়সের ভারও তা থামাতে পারেনি। হযরত আলী হয়তো জানেন না, তার এই নীরব শ্রমের কোনো পরিসংখ্যান নেই। কেউ হিসাব রাখেনি, পাঁচ দশকে তিনি কতটা ময়লা সরিয়েছেন। কোনো পুরস্কারের মঞ্চেও তাকে দাঁড়াতে হয়নি। তবুও বাবুগঞ্জ বাজারের প্রতিটি পরিচ্ছন্ন সকাল তার শ্রমের সাক্ষ্য দেয়।
রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুক্তা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে হযরত আলীকে বিভিন্ন সময়ে খাবারসহ সহায়তা করা হয়। ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পরিষদ কার্যালয়ের বারান্দা ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে তার। তবে এসব সহায়তার বিনিময়ে তার কাজ থেমে থাকে না।
রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাজার পরিষ্কার রাখা আসলে সবার দায়িত্ব। একজন মানুষ এত বছর ধরে নিজের ইচ্ছায় কাজ করে যাচ্ছেন, এটি যেমন প্রশংসার, তেমনি আমাদের জন্য একটা প্রশ্নও। আমরা কি নিজের জায়গাটা পরিষ্কার রাখার দায়িত্বটুকু ঠিকভাবে পালন করছি? হযরত আলীর যে কোনো ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হলে তার পাশে দাঁড়ানো হবে, তাকে সহযোগিতা করা হবে।

