logo

বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ/কারখানা বন্ধে থমকে গেছে শ্রমিকদের উপার্জন, তবুও থেমে নেই খরচ

আতোয়ার রহমান মনির
লক্ষ্মীপুর
কারখানা বন্ধে থমকে গেছে শ্রমিকদের উপার্জন, তবুও থেমে নেই খরচ
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এক সময় যেখানে এক হাজার ৮০০ শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে দিন শুরু হতো, সেখানে এখন শুধু নীরবতা। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ হারিয়েছেন শ্রমিকরা। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেলেও সংসারের খরচ থেমে নেই। শ্রমিকদের একটাই প্রশ্ন—আবার কবে সচল হবে তাদের কর্মস্থল।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ নামে কারখানটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় চলতি বছরের ১৫ মে। সেদিন কারখানার প্রধান ফটকে নোটিশ সাঁটিয়ে বিষয়টি জানানো হয়। ২০১২ সালে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছিল।

সরেজমিন দেখা যায়, একসময় সকাল হলে শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠত কারখানা প্রাঙ্গণ। ভেতর থেকে ভেসে আসত উৎপাদনযন্ত্রের শব্দ। আশপাশের সড়কে দেখা যেত কর্মস্থলে ছুটে চলা শ্রমিকদের ভিড়। এখন সেখানে নীরবতা। বিশাল কারখানাটি পড়ে আছে বন্ধ। দিন-রাত পাহারায় রয়েছেন ১৫ জন নিরাপত্তাকর্মী।

কারখানার নিরাপত্তা সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত মো. শফিক বলেন, এই চাকরির আয়ের ওপর নির্ভর করে আমার সংসার চলে। কারখানা কবে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, সেই চিন্তা থাকে। এখন আগের মতো ডিউটিও নেই। তারপরও আশা করি কারখানাটি সচল হবে।

একই দুশ্চিন্তা নিরাপত্তা পরিদর্শক অহিদুর রহমানেরও। প্রায় ১৬ বছর ধরে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে কাজ করছেন তিনি। মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা বেতনে স্ত্রী সালেহা বেগম, তিন ছেলে ও তিন মেয়ের সংসার চলে। অহিদুর রহমান বলেন, এত বছর ধরে এই চাকরির ওপর সংসার চলছে। এখন কাজ আগের মতো নেই। কখন পুরোপুরি চাকরি চলে যায়, সেই চিন্তায় আছি।

কারখানা এলাকায় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান, মানিক হোসেনসহ কয়েক জনের সঙ্গে। তারা জানান, শুধু শ্রমিকরা নন, আশপাশের ছোট ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ কারখানাটির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়েছে।

উৎপাদন বন্ধের পর বকেয়া বেতন পরিশোধ ও প্রতিষ্ঠানটি সচল করার দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ দিনের কর্মস্থলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা শুধু চাকরি হারাননি, অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের পরিবারও।

শ্রমিকদের দাবি, কারখানাটি পুনরায় সচল করা গেলে তাদের দীর্ঘ দিনের কর্ম ফিরে আসবে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য স্থানীয়ভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায়, কারখানাটি কবে সচল হবে সেদিকে তাকিয়ে আছেন তারা।

আশপাশের এলাকায় থাকা রহিমা বেগম, সুমি আক্তারসহ অন্তত আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক নারী শ্রমিকের কারও স্বামী নেই, কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, কারও আবার সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত মাস শেষে পাওয়া বেতনে। তারা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। পুরুষ শ্রমিকদের কেউ বিকল্প কাজে যুক্ত হতে পারলেও নারীদের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা কাটছে না।

সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে কাজ পেয়েছেন। কিন্তু আমরা মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছি না। বিসিক শিল্পনগরীতেও যোগাযোগ করেছি, কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কারখান কর্তৃপক্ষ জানায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি লে-অফে যায়। তখন স্টাফসহ প্রায় ৯৬৫ জন কর্মী ছিল। তার আগে ছিল ১৮০০ জন শ্রমিক। প্রথমে ৪৫ দিনের লে-অফ দেওয়া হয়। পরে ১৫ দিন করে সময় বাড়ানো হয়। প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস পর্যন্ত কর্মীদের বেতন দেওয়া হয়েছে।

বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) বিপ্লব পাল বলেন, আমরা স্থায়ীভাবে ছাঁটাই করিনি এবং পুরোপুরি বন্ধও করিনি। প্রতিষ্ঠানটি আবার সচল করার চেষ্টা চলছে। অনেক শ্রমিক অন্য কারখানায় চলে গেছেন। আমরা সচল করতে পারলে যারা ফিরে আসবেন, তাদের বিষয়টি হিসাব-নিকাশ করে দেখা হবে।

উৎপাদন বন্ধের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বন্ডেড কারখানা হওয়ায় বন্ড লাইসেন্স নবায়ন ও অডিট নিয়ে জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং জটিলতা, একটি বড় শিপমেন্ট বাতিল এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ায় ব্যবসায়িক সংকট তৈরি হয়েছে।

বিপ্লব পাল বলেন, বন্ডের অডিট, ব্যাংকের সঙ্গে কিছু বিষয় এবং ক্রেতা হারানোর কারণে আমরা সমস্যায় পড়েছি। সবকিছু সমাধান করে প্রতিষ্ঠানটি আবার চালুর চেষ্টা চলছে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে।

প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) টিপু সুলতান চৌধুরীর বলেন, কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় সচল করার চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করলে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব। কারখানাটি পুনরায় সচল করা যায় কি না, তা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।