পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর গ্যাং, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

ফেনী শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় দিন দিন বিস্তার লাভ করছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। আধিপত্য বিস্তার, মাদকসেবন, ছিনতাই, ইভটিজিং এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের অপরাধপ্রবণতা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকেরা।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেনী শহরের মহিপাল, রাজাঝির দিঘির পাড়, নাজির রোড, রামপুর, শাহীন একাডেমি এলাকা, ট্রাংক রোড, মাস্টারপাড়া ও সুলতানপুরসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন দেয়ালে নিজেদের সাংকেতিক নাম লিখে উপস্থিতি জানান দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ভইরা দে গ্রুপ’, ‘ডিকে-২৮’, ‘এস২কে-১০’, ‘ডিআরবি-জেড’, ‘সোয়াগ-৪৭’ ও ‘আরসিএস-৫০’ নামে কয়েকটি গোষ্ঠী এলাকায় পরিচিত।
সম্প্রতি র্যাব ‘ভইরা দে গ্রুপ’-এর এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তাদের তৎপরতা পুরোপুরি কমেনি। এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের অধিকাংশই স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোর অথবা ঝরে পড়া তরুণ। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসেবন ও কারবার, ছিনতাই, ইভটিজিং এবং বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময় অভিযানে দেশীয় অস্ত্রসহ কয়েকজন গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তবে অনেকে জামিন বা মুচলেকায় মুক্ত হয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, পারিবারিক নজরদারির অভাব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রশ্রয় কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। তাদের মতে, মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক কিশোর আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
শহরের নাজির রোড এলাকার এক অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিকেল বা সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে। বিভিন্ন মোড়ে কিশোরদের দলবদ্ধ আড্ডা দেখা যায়। কিছু বললে উল্টো হুমকি দেয়।
পশ্চিম উকিলপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুন বলেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
লিগ্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ (ল্যাব) ফেনী জেলা শাখার সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম বাবুল পাটোয়ারী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়াকেন্দ্রিকভাবে এসব গ্যাং গড়ে উঠছে। কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে তাদের ব্যবহার করেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
দাগনভূঞা আতাতুর্ক স্কুল মার্কেটের ব্যবসায়ী ও আইবিডব্লিউএফ উপজেলা সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, মার্কেট এলাকায় কিছু কিশোর নিয়মিত ধূমপান ও মাদকসেবন করে। নারী ক্রেতাদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগও রয়েছে। এতে অনেকেই বাজারে আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
ফেনী জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক গাজী হাবিবুল্লাহ মানিক বলেন, বিষয়টি তিনি একাধিকবার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করেছেন এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
ফেনী র্যাব-৭-এর অধিনায়ক মিজানুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে তথ্য পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ফেনীর পুলিশ সুপার শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, কিশোর অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। অনেককে আটক করা হয়েছে। তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, অভিভাবকদেরও সন্তানদের চলাফেরা ও সঙ্গ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
জেলা প্রশাসক ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি মনিরা হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। পুলিশকে টহল ও নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
.png)

