নেত্রকোনা/ফসল রক্ষা বাঁধের ব্লক উধাও, রাতের আঁধারে চলছে চুরি

হাওরের ফসল রক্ষায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থায়ী বাঁধই এখন চুরির কারণে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার চরহাইজদা প্রকল্পের বেড়িবাঁধ থেকে রাতের আঁধারে সিসি ব্লক খুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একটি সংবদ্ধ চক্র এসব ব্লক চুরি করে বিক্রি করছে। আবার অনেকে চুরি করা ব্লক নিজ নিজ বসতবাড়ির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন। এর পাশাপাশি বাঁধ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর সুযোগ বুঝে দুর্বৃত্তরা বাঁধ থেকে ব্লক খুলে নিয়ে যায়। এতে কেউ বাধা দিলে তাকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়। চুরি হওয়া প্রতি একশত সিসি ব্লক সাড়ে সাত হাজার টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই এই ব্লকগুলো কিনে বাড়ির আঙিনা ক্ষয় থেকে রক্ষায় ব্যবহার করছেন। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে পরবর্তীতে কেউ কেউ চুরি করা ব্লক ফেরতও দিয়েছেন।
মোহনগঞ্জ উপজেলার চরহাইজদা প্রকল্পের মোট ৪৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ৩৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচ কিলোমিটার অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। হাওরের বোরো ফসলকে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে রক্ষা করতে এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁধটি নির্মাণ করা হলেও, বর্তমানে এর স্থায়িত্ব ও সুরক্ষাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দিনের বেলায় বাঁধে লোকজনের চলাচল থাকায় চুরি করা সম্ভব হয় না। তাই রাতের আঁধারেই সুযোগ বুঝে ব্লক খুলে নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে দু-একটি করে ব্লক সরানো হলেও ধীরে ধীরে বাঁধের বিস্তীর্ণ অংশের ব্লক উধাও হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় বাঁধটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শুধু এই স্থায়ী বাঁধের ব্লকই নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি কেটে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ কেটে মাছ ধরার ঘটনাও ঘটছে। ফলে বাঁধের স্বাভাবিক সুরক্ষা কাঠামো পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
নেত্রকোনায় প্রতিবছর ছয়টি উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল রক্ষায় প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এসব বাঁধের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল। বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে প্রতিবছর ১৯১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কাজ করে, যেখানে বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা।
এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বাঁধের উপকরণ চুরি ও মাটি কেটে ক্ষতির মুখে ফেলার ঘটনায় চরম উদ্বিগ্ন স্থানীয় কৃষকেরা। তাদের আশঙ্কা, বাঁধের ব্লক ও মাটি সরিয়ে ফেলার কারণে যেকোনো অংশ দুর্বল হয়ে সামান্য ঢলেই পানি হাওরে ঢুকে পড়তে পারে। এতে যেমন এক মৌসুমের পুরো ফসল ঝুঁকিতে পড়বে, তেমনি সরকারের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগও বিফলে যাবে।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অলিদুজ্জামান জানান, স্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের ব্লক চুরির বিষয়টিতে এতদিন তাদের নজর ছিল না। তবে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন বলেন, ফসল রক্ষা বাঁধের ব্লক চুরি ও বাঁধ কেটে ক্ষতিসাধনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, চলতি বছরও আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনায় প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল বিনষ্ট হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা। এমন বাস্তবতায় ভবিষ্যতে হাওরের ফসল রক্ষায় নতুন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাঁধের সুরক্ষা ও সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।



