আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও হালদায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের হাড়িঘাটা এলাকার মাঝ দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। নদীর এক পাড়ে সুন্দরপুর ইউনিয়ন, অপর পাড়ে হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল ইউনিয়নের অংশবিশেষ। এখানেই হালদা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে এর শাখা ‘বারোমাসিয়া খাল’। এই খালের কারণে প্রতিবছর বর্ষা ও বন্যার সময় তীব্র স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এলাকার বেড়িবাঁধ। ফলে নদীভাঙনে সুন্দরপুরের বহু বসতভিটা ও আবাদি জমি হুমকির মুখে পড়ে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমি ও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।
এদিকে ভাঙন রোধে প্রতিবছরই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারকাজ পরিচালনা করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাবে এসব বাঁধ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক মাস বা এক মৌসুমের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে প্রতিবছর সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলছে না। এবারও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হালদা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করছে এবং সেই বালু দিয়েই নদীতীর রক্ষার কাজ পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হালদা নদী থেকে বালু উত্তোলনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) হালদা নদীর সুন্দরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়িঘাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। প্রকল্প এলাকার অদূরে হালদা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই বালু সরাসরি নদীতীরে ফেলা হচ্ছে এবং তা দিয়েই ভাঙনরোধী বাঁধ নির্মাণের কাজ চালানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে দিন-রাত অব্যাহতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ড্রেজার পরিচালনা করে বালু উত্তোলনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হালদা নদী রক্ষার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অথচ সেই প্রকল্পের কাজেই নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ও স্থানীয়দের ‘সহানুভূতিকে’ কাজে লাগিয়ে নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে চড়া মূল্যে ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করছে স্থানীয় সিনা মেম্বারের নেতৃত্বে কয়েকজন বাসিন্দা। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, হালদা নদীর ভাঙন রোধে ফটিকছড়ির সুন্দরপুর এলাকার হাড়িঘাটায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশন ও আমিন অ্যান্ড কোং। বর্তমানে নদীতীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কাজটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুনরায় কাজ শুরু করা হয়। আমরা স্থানীয় বাসিন্দা সিনা মেম্বারদের কাছ থেকে বালু কিনে নিচ্ছি। তারা কোথা থেকে বালু সরবরাহ করছে, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়।’
হালদা নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সামশুল আলম (সিনা মেম্বার) বলেন, ‘যেখান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, সেটি আমার নিজস্ব জায়গা। এখন বালু উত্তোলনের জন্য আবার কার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে?’ উল্টো মেজাজ হারিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘গত ১৭ বছর আপনারা কোথায় ছিলেন?’ তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং হালদা নদী থেকে বালু উত্তোলনের বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সোহাগ তালুকদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’
বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত অন্যায় ও আত্মঘাতী একটি কাজ। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আহ্বান জানাব, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। পাশাপাশি প্রশাসনেরও এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত।’
এ বিষয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘হালদা নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
.png)


