logo
Advertisement

কুষ্টিয়া/প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৪১৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট নিউজ,কুষ্টিয়া
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৪১৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়
ধলনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কুষ্টিয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। জেলার মোট ৮০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪১৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী কোনো প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে টেনেটুনে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

Advertisement

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জুলাই পর্যন্ত জেলার ৪১৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ পদ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার কথা এবং বাকি ২০ শতাংশ পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে থাকায় এই শূন্য পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৫১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৫টিতে, মিরপুরের ১৪৩টির মধ্যে ৪৯টিতে, ভেড়ামারার ৬০টির মধ্যে ২৪টিতে, দৌলতপুরের ২১৭টির মধ্যে ১৩২টিতে, কুমারখালীর ১৪৭টির মধ্যে ৭৯টিতে এবং খোকসার ৮৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে দৌলতপুর উপজেলায়, যেখানে ২১৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩২টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। এরপরই কুষ্টিয়া সদর ও কুমারখালীতে যথাক্রমে ৭৫ ও ৭৯টি পদ শূন্য।

জেলায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ৯৭৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। বিপুলসংখ্যক এই শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনায় রেখে জেলার অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীরা।

জেলা শিক্ষা অফিসের সূত্র জানায়, প্রধান শিক্ষক পদ খালি থাকার পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ। সহকারী শিক্ষকদের সময়মতো পদোন্নতি না হওয়া এর অন্যতম বড় কারণ। এছাড়া অতীতে নিয়োগ ও পদায়ন সংক্রান্ত জটিলতা, মামলা ও প্রশাসনিক নানা কারণে শূন্য পদ পূরণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

পাশাপাশি, একসময় রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও ২০০৯ সালের জুন মাস থেকে সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে এসব বিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়ন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া এডিপি ও আইডিএ প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির পর পদায়ন নিয়ে মামলা, পুল শিক্ষক এবং বিভিন্ন সময়ে প্যানেলভুক্ত শিক্ষকদের নিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতাও প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় সাধারণত বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হয়। এতে করে তাকে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের দৈনিক প্রশাসনিক কাজ, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন, সরকারি চিঠিপত্রের উত্তর দেওয়া, বিভিন্ন সভায় যোগদান, নথিপত্র সংরক্ষণ ও দাপ্তরিক কাজ সামলাতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সিংহভাগ সময় ব্যয় হয়ে যায়। ফলে শ্রেণিকক্ষে তাদের নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে, কিছু বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষকের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি অন্য শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ বাড়ছে, যা শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মাছপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজমি আরা সাথী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা। এ কারণে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন নানামুখী কাজ করতে গিয়ে চরম জটিলতা তৈরি হচ্ছে। যেহেতু বিষয়টি সরকারি প্রক্রিয়ার বিষয়, তাই আমাদের কিছু করার নেই। দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক পদায়ন করা হলে বিদ্যালয়ের পাঠদানসহ প্রশাসনিক সমস্যা অনেক কমে যেত।

কুমারখালী উপজেলার ধলনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সাচ্চু আক্ষেপ করে বলেন, আমি কোমলমতি শিশুদের ক্লাস নেব, নাকি প্রশাসনিক কাজ সামলাব? দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া হলে এই সংকট কেটে যাবে।

শিক্ষানুরাগী অ্যাডভোকেট শামীম উল হাসান অপু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এতগুলো বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর মানসিক ও শারীরিক অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এতে একদিকে যেমন প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম জানান, জেলার বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা জরুরি। এজন্য পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে পদগুলো পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে।

বিষয় :