logo
Advertisement

বোরো ধান নিয়ে দুর্ভোগে সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকেরা

বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জ, সিলেট
বোরো ধান নিয়ে দুর্ভোগে সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকেরা
তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর এলাকায় বোরো ধান শুকানোর কাজ করছেন কৃষাণীরা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

বোরো ফসলের ভান্ডারখ্যাত হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ। এ জেলায় প্রতিবছর সোয়া দুই লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়। প্রায় ১৪ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন হয় প্রতিবছর। গত বোরো মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বেশ কিছু জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়েছিল।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। জেলার প্রায় ১০ লাখ কৃষক বোরো ধানের চাষ করেন।

‘ধান গোলায় উঠলেই হাওরের কৃষকেরা ধনী’—একসময় এমন প্রবাদ থাকলেও এ বছর বোরো ধান নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।

হাওরপাড়ের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন, গত বৈশাখে বোরো ধান কাটা ও মাড়াইয়ের সময় সঠিক সময়ে রোদ না পাওয়ায় অনেক ধানের রং পরিবর্তিত হয়ে কিছুটা কালচে হয়েছে। কালচে রঙের ধান বিক্রি করতে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ভালো রঙের ধানেরও কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না।

এদিকে গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বোরো ধান কেনার কথা ছিল। কিন্তু আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহেই হঠাৎ ধান কেনা বন্ধ করে দেয় খাদ্য বিভাগ। এরপর থেকে বোরো ধানের দাম কমতে শুরু করে। বর্তমানে হাওরে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম নেই, পাইকারও নেই। ধানের সঠিক দাম না পাওয়া এবং বিক্রি করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।

ধান ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হাওর এলাকার ধান কিনে আশুগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের বড় বড় চালকলগুলোতে বিক্রি করা হয়। কিন্তু ধানের রং ভালো না থাকায় এবং চাহিদা কম থাকায় এ বছর অন্য বছরের তুলনায় ধানের দাম অনেক কম। এতে সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা।

কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের দাবি, নানা অজুহাতে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে না। অন্যদিকে বিদেশ থেকে বেশি দামে চাল আমদানি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ী ও চালকলমালিকদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারিভাবে সুনামগঞ্জের কৃষকদের কাছ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়েছে ২০ হাজার ৮৫ টন।

সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফেরদৌস জাহান বলেন, পর্যাপ্ত ধান-চাল মজুত রয়েছে। সুনামগঞ্জ থেকে প্রচুর বোরো ধান কেনা হয়েছে। এলাকার অনেক কৃষক সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করেছেন। সরকার কেন্দ্র থেকে ধান কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। সার্বিক তথ্য জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো তথ্য দিতে পারবেন না বলে জানান তিনি। তথ্য পেতে আবেদন করতে বলেন তিনি।

জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক গ্রামের কৃষক মো. মিছবাহুল কবীর চৌধুরী বলেন, ধান নিয়ে মহাদুর্ভোগে আছি। এমন জানলে ধান চাষ করতাম না। ৩০ কিয়ার জমি চাষাবাদ, ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোসহ মোট খরচ হয়েছিল আড়াই লাখ টাকা। ধান পেয়েছিলাম ৪০০ মণ। কিন্তু এখন ধানের দাম নেই। ভালো ধান প্রতি মণ ৭০০-৮০০ টাকা, আর যেগুলো একটু কালচে, সেগুলোর দাম ৫০০ টাকা মণ। ধান কেনার পাইকারও নেই। ধান বিক্রি করতে না পেরে সংকটে আছি। এভাবে ধানের দাম থাকলে ধান চাষে কেউ আগ্রহী হবে না।

দিরাই উপজেলার রফিনগর গ্রামের কৃষক জুনাইদ আহমদ বলেন, ধানের দাম নেই, পাইকারও নেই। খুব বিপদে আছি ধান নিয়ে। ২৮ কিয়ার (প্রতি কিয়ারে ৩০ শতক) জমি চাষ করতে খরচ হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ টাকা। ধান কাটার সময় শ্রমিকদের মজুরি ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। আর এখন ধানের দাম ৮০০ টাকা মণ। কালচে ধানের দাম ৪০০-৫০০ টাকা। ৩০০ মণ ভালো ও ১০০ মণ কালচে ধান আছে। কিন্তু বিক্রি করতে পারছি না।

শাল্লা উপজেলার আটগাঁও গ্রামের বাসিন্দা অলিউর রহমান চৌধুরী ইমন বলেন, বৈশাখে ছিল কাঁচা ধানের দুর্ভোগ, এখন গোলার শুকনো ধান নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছি। হাওরের কোনো কৃষকই ধান বিক্রি করতে পারছেন না। সরকারও ধান কিনছে না। হাওরাঞ্চলে ধানের পাইকার নেই। ভালো ধানের দাম মাত্র ৭০০-৮০০ টাকা মণ। ধান বিক্রি করতে না পারায় কৃষকেরা ঘরবাড়ি মেরামত, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ ও আগামী বোরো মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নিতে পারছেন না। প্রতিবছর ৮০ কিয়ার জমি কৃষকদের কাছে বর্গা দিই। কিন্তু এ বছর ধান বিক্রি না হওয়ায় জমি বর্গা দিতে পারছি না। জমি বর্গা নিতেও কৃষকদের আগ্রহ কম।

সুনামগঞ্জের ধান ক্রয়-বিক্রয়ের সবচেয়ে বড় আড়ত মধ্যনগর বাজার। মধ্যনগর আড়তদার কল্যাণ সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুন সরকার বলেন, এ বছর ধান কেনাবেচা খুবই মন্দা। অন্য বছর প্রতিদিন বাজারে ৩০-৩২ হাজার মণ ধান কেনাবেচা হতো। কিন্তু এ বছর ধানের রং ভালো না থাকায় এবং দেশের বড় চালকলগুলোতে ধানের চাহিদা কম থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭-৮০০ মণ ধান কেনাবেচা হচ্ছে। কৃষকেরা ধান বিক্রি করতে না পেরে হতাশায় পড়েছেন।

বরুন সরকার আরও জানান, চিকন ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ভালো রঙের হাইব্রিড ধান ৮০০-৯০০ টাকা এবং কালচে রঙের ধান ৫০০-৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। কালচে রঙের ধান কেউ কিনতে চান না।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন, সুনামগঞ্জের সভাপতি রাজু আহমদ বলেন, হাওরের কৃষকদের একমাত্র ফসল বোরো ধান। লাখ লাখ কৃষক পরিবার বোরো ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। কৃষকেরা কষ্টে ফলানো ধানের দাম না পেলেও সরকার নানা সময়ে বিদেশ থেকে বেশি দামে চাল আমদানি করছে। নানা অজুহাতে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে না। অন্যদিকে পাইকারেরাও কম দামে ধান কিনতে চাইছেন। ব্যবসায়ী ও চালকলমালিকদের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম বাড়লেও শুধু ধান উৎপাদনকারী কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অবস্থা চলতে থাকলে হাওরপাড়ের কৃষকেরা বোরো ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন।

বোরো ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে আরও ধান সংগ্রহ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।

তিনি বলেন, হাওরপাড়ের কৃষকদের কাছ থেকে আরও বেশি বোরো ধান সরকারিভাবে কেনার জন্য তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) দিয়েছেন। ডিও লেটারে কৃষকদের স্বার্থে আরও বোরো ধান কেনার অনুরোধ করেছেন তিনি। কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হলে তারা উপকৃত হবেন।