logo
ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল

লাখ লাখ টাকা টোল-চাঁদা আদায়, নেই যাত্রী ছাউনি-বাথরুম-বসার ব্যবস্থা

রহিম শুভ
ঠাকুরগাঁও
লাখ লাখ টাকা টোল-চাঁদা আদায়, নেই যাত্রী ছাউনি-বাথরুম-বসার ব্যবস্থা
ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

‘২৩ বছর ধরে টোল আর চাঁদা দিচ্ছি। গাড়ি প্রতি ৩/৪শ টাকা নেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০টা গাড়ি চলে। উন্নয়নের কাজে ব্যবহার হবে এই টাকা। কিন্তু কোনো উন্নয়ন হয়নি সব গেছে শ্রমিক নেতাদের পকেটে। নানান অযুহাতে তারা পকেট ভরসে। আর আমাদের যে দুঃখ সেই দুঃখ আছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটির দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের বাসচালক আব্দুল মালেক।

তিনি বলেন, বাস টার্মিনালটি যদি দেখেন আপনার রুচি হবে না। কোনো বাথরুম নেই, সবখানে ময়লা। বেশি কষ্ট পায় নারী যাত্রীরা। বাধ্য হয়ে আমরা কোনো তেল পাম্পে গাড়ি থামিয়ে তাদের বাথরুমের ব্যবস্থা করে দেই। বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। বছরে লাখ লাখ টাকা। তারা যদি অর্ধেক টাকাও খরচ করত বাস টার্মিনালটির কয়েকটা বাথরুম আর বসার জন্য কয়েকটা চেয়ারের ব্যবস্থা কার যেত। তাহলে যাত্রীদের ভোগান্তি কম হতো। কিন্তু সব চাঁদা নেতারা খেয়ে নেয়।

ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে ৫ বিঘা জমির ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে বাস টার্মিনালটি নির্মিত হয়। তৎকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এ টার্মিনালের উদ্বোধন করেছিলেন। তবে উদ্বোধনের পর এটি আর ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমানে ন্যূনতম যাত্রী সুবিধা ছাড়াই কোনো মতো চলছে বাস টার্মিনালটি।

বাসচালক বজলু হক বলেন, ২৩ বছরে কয়েক কোটি টাকা টোল দিছি আমরা এই বাস টার্মিনালে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। টাকার হিসেব নেই। বাস টার্মিনালটি মেরামতের কথা বলে সব টাকা শ্রমিক নেতারা খেয়ে নিছে। আমাদের যে দুঃখ সেটাই আছে। দেশে নতুন সরকার আসছে, যাত্রীদের কথা ভেবে যদি তারা বাস টার্মিনালটি মেরামত করে দেয় তাহলে অনেক ভালো হয়। নেতারা চাঁদা তুলে কোনো দিন এটা ঠিক করবে না। তারা সব খেয়ে শেষ করে দেবে।

আরেক বাসচালক মকসেদুল হক বলেন, এইখান থেকে যারা রংপুরে যান তারা বেশিরভাগ রোগী। টার্মিনালে এসে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। অনন্ত একটা যাত্রীর ছাউনি দিয়ে যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা করা হোক।

মাকে রংপুর চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন বিলকিস বেগম। তিনি বলেন, মা ভালোভাবে হাঁটতে পারে না। টার্মিনাল থেকে ১ ঘণ্টা পর পর গাড়ি ছাড়ে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। টার্মিনালের ভেতরের পরিবেশ এত খারাপ যে ঢোকা যায় না। পাশের তেলপাম্পের ওয়াশরুম ব্যবহার করতে হয়। এটা মূলসড়ক সব সময় বড় বড় গাড়ি চলে। যাত্রীরা রাস্তা পার হতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। কবে যে টার্মিনালটি ঠিক হবে আর আমরা ওইখানে বসে অপেক্ষা করে যেতে পারব। সরকারের কাছে অনুরোধ দ্রুত এটার একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

বিদিশা নামে আরেক যাত্রী বলেন, আমার বাসা ঠাকুরগাঁও রোডে। আমি রংপুরে পড়াশোনা করি। নিয়মিত আমাকে রংপুরে থেকে যাওয়া-আসা করতে হয়। ঠাকুরগাঁও বাস টার্মিনালটির অবস্থা এত খারাপ যে যাত্রীরা যে দাঁড়াবে তার মতো ব্যবস্থা নেই। রোদ হোক বা বৃষ্টি এইখানে যাত্রী ছাউনিও নেই একটা। ভেতরে বিল্ডিং আছে কোন বসার পরিবেশ নেই, বাথরুম নেই। এত টাকা টোল নেয়। তারা ইচ্ছা করলে কয়েকটা বাথরুম আর যাত্রী ছাউনির ব্যবস্থা করে দিতে পারে। কিন্তু তা না সব পকেটে ভরবে।

আবু সালেহ নামে আরেক যাত্রী বলেন, যারা রংপুর যায় তারা বেশিরভাগ রোগী। এই টার্মিনালটিতে যত টোল ওঠা হয় তার ১ মাসের টোল দিয়ে যাত্রী ছাউনিসহ অনন্ত ১/২ টা বাথরুম ঠিক করে যাত্রীদের ব্যবহারে উপযোগী করা যেতে পারে। কিন্তু তা না করে সব টাকা খায় নেতারা। আর যাত্রীদের ভোগান্তির কথা একবারও চিন্তা করে না তারা।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও বাস শ্রমিকের সভাপতি মো. দানেশ বলেন, আমরা টোল নেই সেটা আমরা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি। যেমন- কোনো বাস চালক অসুস্থ হলে বা কারো মেয়ের বিয়ে হলে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করি। অনেক চালক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে তাদের সাহায্য করতে হয়। স্থানীয় নেতাদের দিতে হয়। সব মিলে তেমন কোন টাকা থাকে না আমাদের কাছে। তবে সরকার টার্মিনালটি পুনরায় মেরামত করলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার খায়রুল ইসলাম বলেন, বহু দিন থেকে ঠাকুরগাঁও বাস টার্মিনালটি অবস্থা অনেক খারাপ। বাথরুম নেই বসার ব্যবস্থা নেই। যাত্রী ছাউনি নেই। আমরা ইতোমধ্যে যাত্রীর ভোগান্তি নিরসনে এটা মেরামতের উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেছি। যত দ্রুত সম্ভব এটা মেরামত করে পুনরায় চালু হবে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রসাশক রফিকুল হক বলেন, ২৩ বছর ধরে ঠাকুরগাঁওয়ে বাস টার্মিনালটি আসলে অবহেলায় পড়ে আছে। বিল্ডিং আছে যদি অল্প কিছু মেরামত করা যায় তাহলে যাত্রীরা সেটা ব্যবহার করতে পারবে। আমরা যত দ্রুত সেটা মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।