logo

৪৯তম বিসিএস/গোপালগঞ্জের ১১ প্রার্থীর ৯ জনই বাদ, মেধাক্রমের প্রথমজনও সেই তালিকায়

গোপালগঞ্জের ১১ প্রার্থীর ৯ জনই বাদ, মেধাক্রমের প্রথমজনও সেই তালিকায়
ছবি: প্রতীকী ছবি

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর গোপালগঞ্জের প্রার্থীদের ফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। জেলার ১১ প্রার্থীর মধ্যে ৯ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেটে নেই। বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের মেধাক্রমে প্রথম, একই বিভাগের তৃতীয় এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের পঞ্চমসহ বিভিন্ন বিভাগের মেধাক্রমে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরাও রয়েছেন। এ অবস্থায় প্রার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, গোপালগঞ্জের পরিচয় তাদের নিয়োগের ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না।

তবে শুধু গোপালগঞ্জের পরিচয়ের কারণে এসব প্রার্থী বাদ পড়েছেন—এমন কোনো তথ্য বা সরকারি নথি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। চূড়ান্ত গেজেটেও ৫৭ প্রার্থীর নাম না থাকার কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

বাদ পড়া ৯ জন হলেন—মো. নূরনবী শেখ, আহম্মদ উল্লাহ, সোহাগ মন্ডল, বিপ্লব বাড়ৈ, শেখ আরাফাত কবির, বুশরা জাহান, মো. সাজ্জাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মো. রাকিবুল ইসলাম।

প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নূরনবী শেখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। আহম্মদ উল্লাহ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও মেধাক্রমে প্রথম। একই বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের সোহাগ মন্ডলের মেধাক্রম তৃতীয়।

এছাড়া বিপ্লব বাড়ৈ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এবং মেধাক্রমে পঞ্চম। ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শেখ আরাফাত কবিরের মেধাক্রম ১৫তম এবং ইংরেজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের বুশরা জাহানের মেধাক্রম ১৪তম।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মো. সাজ্জাদ হোসেনের মেধাক্রম ৩০। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলামের মেধাক্রম ২৫ এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. রাকিবুল ইসলামের মেধাক্রম ৩৭ বলে জানিয়েছেন প্রার্থীরা।

বাদ পড়া প্রার্থী নূরনবী শেখ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া এবং আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ঢাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পরও গোপালগঞ্জের পরিচয়ের কারণে তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

নূরনবী শেখ আরও বলেন, ‘গোপালগঞ্জের মানুষ হয়েও আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জুলাই আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলাম। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ঢাকার নিরাপত্তা রক্ষায় রাতভর পাহারাও দিয়েছি। এরপরও যদি শুধু গোপালগঞ্জের মানুষ হওয়ার কারণে সরকারি চাকরিতে আমাদের অধিকার না থাকে, তাহলে সেটি প্রশ্নের বিষয়।’

মেধাক্রমে প্রথম হওয়া আহম্মদ উল্লাহ জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় বসবাস করছেন। এর আগে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। তার দাবি, গোপালগঞ্জে বাড়ি হওয়ার কারণেই তাকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

আহম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ৯ জনই বাদ পড়েছেন, আর দুজনকে নেওয়া হয়েছে। ওই দুজনের বাড়ি গোপালগঞ্জে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে অন্য জেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। আমি মনে করি, আমার বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ার কারণেই আমাকে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা এবং পরিবারের কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।

তবে বাদ পড়া আরেক প্রার্থী মো. রাকিবুল ইসলাম গোপালগঞ্জের পরিচয়ের কারণে বাদ পড়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে মনে করেন না। অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী জানান, তিনি প্রায় ১৩ বছর ধরে গোপালগঞ্জের বাইরে অবস্থান করছেন। যশোরের এম এম কলেজে পড়াশোনা শেষ করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাবা একজন দিনমজুর ও কাঠমিস্ত্রি। তিনি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বাবা দিন এনে দিন খেয়ে আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন। আমাকে কী কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষই বলতে পারবে।’

এদিকে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত দুজন প্রার্থীর একজন তন্ময়। তিনি আইসিটি ক্যাডারে মেধাক্রমে ২১তম হয়েছেন বলে জানা গেছে। তার শিক্ষাজীবনের তথ্য অনুযায়ী, স্কুল ও কলেজজীবন কেটেছে ঝিনাইদহে এবং উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট)। তার বাবা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত ছিলেন বলেও জানা গেছে।

অন্য নির্বাচিত প্রার্থী মো. অপু খান ম্যানেজমেন্ট ক্যাডারে মেধাক্রমে ষষ্ঠ হয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তিনি ফরিদপুরে বসবাস করছেন।

এই দুই প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়া এবং গোপালগঞ্জের ৯ প্রার্থীর বাদ পড়াকে ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো প্রার্থীকে শুধু জেলার পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো নথি বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষার চূড়ান্ত গেজেট বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রবেশ পদে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে পিএসসির চূড়ান্ত ফলে ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। ফলে ৫৭ জনের নাম চূড়ান্ত গেজেটে স্থান পায়নি।

এর আগে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি। সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন পদে ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পিএসসি জানিয়েছিল, যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ১৫টি পদে কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হয়নি।

চূড়ান্ত গেজেটে বাদ পড়া ৫৭ প্রার্থীর নাম না থাকার কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে পিএসসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।