৩০ বছরের রাতজাগা জীবনে নেই ছুটি

রাত যত গভীর হয়, বাজার ততটা নিস্তব্ধ হয়ে আসে। একে একে বন্ধ হয়ে যায় সব দোকানের শাটার। মানুষের কোলাহল থেমে গিয়ে চারপাশে নেমে আসে নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে ভেসে আসে বয়োজ্যেষ্ঠ কণ্ঠ–‘সাবধান, হুঁশিয়ার।’ সত্তোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ দিন তিন দশক ধরে রাত জেগে অন্যের সম্পদ পাহারা দিচ্ছেন। এই ত্রিশ বছরের রাতজাগা জীবনে তার কোনো ছুটি নেই। প্রতিদিন দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকতে হয় তাকে।
তিনি করিম খান। বয়স ৭৫ বছর। মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটমাঝি ইউনিয়নের দক্ষিণ চিরাইপাড়া গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। প্রায় তিন দশক ধরে টুবিয়া বাজারের নৈশপ্রহরী হিসেবে রাতে পাহারা দিচ্ছেন তিনি।
যে বয়সে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে চলার কথা, সে বয়সেও করিমকে জীবিকার তাগিদে রাত জাগতে হয়। আছে হৃদযন্ত্রের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক ও আলসারসহ নানা অসুখ। নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার প্রয়োজন। চিকিৎসার খরচ জোগাতে তার সামান্য আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়।
করিম খানের কথায়, তার জীবনের হিসাবটা বড়ই নির্মম—আয় বাড়ছে না, বরং বয়সের সঙ্গে বাড়ছে প্রয়োজন; কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটানোর মতো সামর্থ্য নেই।
তিনি বলেন, বয়সের কারণে এখন ভারী কোনো কাজ করার ক্ষমতা নেই। নিয়মিত ডাক্তার দেখানো ও ওষুধ কিনতে মাসে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা চলে যায়। নৈশপ্রহরীর কাজ থেকে পাওয়া প্রায় সাত হাজার টাকার মধ্যে চিকিৎসা খরচ মেটানোর পর হাতে থাকে সামান্য কিছু টাকা। সেই টাকায় পুরো মাসের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো প্রায় অসম্ভব।
করিম খানের কর্মজীবনও ছিল সংগ্রামে ভরা। যৌবনের দীর্ঘ সময় ঢাকায় একটি চালের আড়তে কাজ করেছেন। প্রায় দুই দশক সেখানে শ্রম দেওয়ার পর বয়সের ভারে কঠিন কাজ করতে না পেরে ফিরে আসেন গ্রামে। গ্রামে ফিরে নতুন কোনো কাজের সন্ধান পাননি। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে তখন টুবিয়া বাজার কমিটির কাছে কাজের আবেদন করেন। সেখান থেকে শুরু নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর—অন্যের দোকানপাট ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাত জেগেছেন করিম। তার নিজের জীবনের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ যেন রয়ে গেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
করিম খানের সংসারে ছিলেন স্ত্রী রেবাতুন নেসা, এক মেয়ে হালানী বেগম ও দুই ছেলে ইকবাল খান ও নিবুল খান। প্রায় ১০ বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সংসারের শেষ আশ্রয়টুকু হারান তিনি।
মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছেলেরাও নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। সন্তানদেরও আর্থিক টানাপোড়েন রয়েছে। বৃদ্ধ বাবার পুরো দায়িত্ব নেওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নেই।
বৃদ্ধ করিমের ভাষায়, ‘আমাকে দেখার মতো আমি ছাড়া আর কেউ নেই।’ এই একটি বাক্যে যেন তার দীর্ঘ জীবনের নিঃসঙ্গতার পুরো গল্পটা ধরা পড়ে।
করিমের ছোট ছেলে নিবুল খানও বাবার কষ্টের কথা অস্বীকার করেন না। কিন্তু নিজের সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়।
নিবুল জানান, তার নিজেরও নিয়মিত কাজ নেই। স্ত্রী বিদেশে থাকেন এবং তার পাঠানো অর্থে সংসার চলে। সেই সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি মাঝেমধ্যে বাবাকে কিছু টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
বৃদ্ধ বাবাকে কাজ না করার জন্য বলা হলেও করিম তা মানতে চান না। কারণ, কাজটি ছেড়ে দিলে তার নিজের খাবার ও ওষুধের খরচ চালানোর আর কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিকুল রহমান বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি করিম খানকে টুবিয়া বাজারে রাত পাহারা দিতে দেখে আসছেন। তখন তিনি ছিলেন কর্মক্ষম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে, শরীর ভেঙেছে, রোগ বাসা বেঁধেছে। তবুও জীবিকার প্রয়োজনে রাতের পাহারা ছাড়তে পারেননি।
টুবিয়া বাজারের দোকানদার আলমগীর বলেন, বাজারটি ছোট হলেও করিমের প্রতি ব্যবসায়ীদের সহানুভূতি রয়েছে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন তারা। সন্তানরা যদি পুরো দায়িত্ব নিতে পারতেন, তাহলে এই বয়সে করিমকে আর রাত জেগে কাজ করতে হতো না।
স্থানীয় ঘটমাঝি ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইউনুস খান বলেন, এই বয়সে করিম খানের রাত পাহারার কাজ করা অত্যন্ত কষ্টকর। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁকে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
মাদারীপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিশ্বজিৎ বৈদ্য নাদিম বলেন, করিম খান সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করলে প্রচলিত নিয়ম ও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী তাকে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানাও জানান, করিম খান আবেদন করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


