logo
Advertisement

৪০ কোটি টাকার পানির প্রকল্প অচল, দিঘি ঘিরে লাখ টাকার বাণিজ্য

শেখ সোহেল
বাগেরহাট
৪০ কোটি টাকার পানির প্রকল্প অচল, দিঘি ঘিরে লাখ টাকার বাণিজ্য
ভৈরব নদ থেকে পানি এনে ‘পচা দিঘি’-তে সংরক্ষণের পাইপলাইন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাট পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। অচল প্রকল্প সচল করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে মিলছে না কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ। উল্টো প্রকল্পের জন্য পানি সংরক্ষণ করতে ‘পচা দিঘি’-কে ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে এখন গড়ে উঠেছে মাছ শিকারের বাণিজ্য।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের নির্মাণকাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও পরে প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন অচল থাকায় ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, পাইপলাইন ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল সালাম তালুকদার বলেন, এই পাম্পের তো সবকিছু চোরে নিয়ে গেছে। ভেতরের জেনারেটরের তার নেই, পাম্পের তার নেই, সার্ভিস লাইনের তারও নেই। বহুদিন ধরে এটি বন্ধ পড়ে আছে। ঘরের চাল নেই, পেছনের জানালা ভাঙা। তাই চোর ঢুকে সব নিয়ে যায়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে ‘পচা দিঘি’-তে সংরক্ষণ করার কথা ছিল। পরে ওই পানি ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে বাগেরহাট পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহ করার কথা। উল্টো পচা দিঘিতে এখন চলছে বাণিজ্যিক মাছ শিকার। গত ৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর দিঘিতে বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন দিঘির চারপাশে ১০৮টি ঘাটে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা হয় এবং প্রতিটি ঘাটের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। এর মাত্র ১৪ দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ও শুক্রবার আবারও মাছ শিকারের আয়োজন করা হয়েছে। বারবার দিঘিতে মাছ শিকারের আয়োজন হওয়ায় পানি সরবরাহ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

প্রকল্পের জন্য পানি সংরক্ষণের ‘পচা দিঘি’-তে চলছে মাছ শিকার। ছবি: এশিয়া পোস্ট
প্রকল্পের জন্য পানি সংরক্ষণের ‘পচা দিঘি’-তে চলছে মাছ শিকার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরেজমিনে দিঘির পানিতে পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানির বোতল ও ওয়ানটাইম প্লেটসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ চাষ ও বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের কারণে দিঘির পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আগে পানিতে মাছ দেখা যেত, পানি পরিষ্কার ছিল। এখন পানিতে গন্ধ থাকায় রান্না করতে পারি না। কিছুদিন আগে এখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা হয়েছে। এরপর পানি পরিষ্কারের জন্য চুন বা প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিঘিটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার কারণে পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তারা দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে দিঘিটিকে পানি সরবরাহের কাজে ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন।

পচা দিঘির ইজারাদার ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, এখানে সরকার যদি ওয়াটার প্লান্ট করে, তাহলে আমাদের যারা আছি আমরাও চলে যাব। আমরা আসলে এখানে পানির কোনো ক্ষতি করি না। কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করি না। প্রতিবছর সরকার ২১ লাখ টাকা রেভিনিউ নেয় এখানে মৎস্য চাষ করার জন্য। সরকার যদি আমাদের চুক্তি বাতিল করে, আমরা চলে যাব। পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে ইজারাদার হিসেবে তারা দিঘি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, পচা দিঘিটি ছয় বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প চালুর স্বার্থে ইজারার মেয়াদ কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পৌরসভার একটি প্রকল্প আছে। সেটির জন্য ইজারার মেয়াদ কমিয়ে আনা গেলে প্রকল্পটি শুরু করা যাবে। কিন্তু সেখানে যিনি ইজারাদার আছেন তার কাছ থেকে আসলে সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। পরে আমি কথা বলে দেখব বিষয়টি।

জেলা প্রশাসকের এমন বক্তব্যের পরও ১৪ দিনের মাথায় একই দিঘিতে আবারও বড়শি দিয়ে মাছ শিকারের আয়োজন হওয়ায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।