
টাঙ্গাইলের ১৫৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী সন্তোষ জাহ্নবী উচ্চ বিদ্যালয়। জানালাবিহীন বিশাল ভবনে রয়েছে ১০১টি দরজা, আর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সূর্যঘড়ি আজও জানান দেয় সময়ের হিসাব। ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য এই নিদর্শন দেড় শতাব্দী পেরিয়ে এখন জরাজীর্ণ। ঐতিহ্যবাহী ভবনটি রক্ষায় দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
১৮৭০ সালে জমিদার শ্রীমতি জাহ্নবী চৌধুরানীর প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। জানালাবিহীন ১০টি কক্ষে রয়েছে ১০১টি দরজা, যা ব্রিটিশ আমলে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে অনন্য নিদর্শন সূর্যঘড়ি। একটি স্তম্ভে সূর্যের আলোর ছায়া ও নির্দিষ্ট পরিমাপের ভিত্তিতে ঘণ্টা নির্ধারণ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, দেড় শতাব্দী পেরিয়েও এই সূর্যঘড়ির সময় বর্তমান ঘড়ির সঙ্গে মিল রেখে চলে। তাছাড়া বিদ্যালয়ে রয়েছে আয়না দিঘী। ব্রিটিশ আমলের এই দিঘীর পানি আয়নার মতো উজ্জ্বল ছিল বিধায় এর নামকরণ করা হয়।
জানা যায়, জমিদার জাহ্নবী চৌধুরীরানী এলাকার মানুষের লেখাপড়া কথা চিন্তা করে তিনি এ স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জাহ্নবী চৌধুরানীর জমিদার ছিল ছয়আনী এলাকাজুড়ে। সে সময় নয় বছর বয়সে তার বিবাহ হয়। বিয়ের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি স্বামী হারান। স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি কলকাতায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করে বিদ্যালয়ের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনে নিয়ে আসেন। সে সময় দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য মাসিক বৃত্তি ২২০ টাকা এবং ৩২ জন শিক্ষক কর্মচারীদের জন্য সম্মানী ও ভাতা ১৫০ টাকা করে তার নিজ তহবিল থেকে দিতেন। তখনকার সময় টাঙ্গাইল জেলা ছিল বৃহত্তম ময়মনসিংহ বিভাগের। তৎকালীন সময়ে এই স্কুলটি ময়মনসিংহ বিভাগের দ্বিতীয়তম ইংলিশ ভার্সন স্কুল ছিল। এই ভবনে প্রতি কক্ষে ১৫টি দরজা করে মোট ১০১টি দরজা রয়েছে।

ব্রিটিশ আমলের সময়ে বিদ্যুৎ কিংবা সোলার প্যানেল না থাকায় মূলত বাইরের আলো আসার জন্য এই দরজাগুলো স্থাপন করা। ব্রিটিশ স্থাপত্য তৈরি এই ভবনের দেওয়াল পুরু ২২ ইঞ্চি এবং তাদের উচ্চতা ২২ ফুট। সেখানে রয়েছে মোঘল আমলের সিন্দুকসহ নানা ধরনের ঐতিহাসিক ছবি। এছাড়া বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রয়েছে পদার্থ রসায়ন ও জীব বিজ্ঞানের ব্যবহারিক টুলস।
তৎকালীন সময় বিদ্যালয়ের সময় জানার জন্য সূর্যঘড়ি স্থাপন করেন জমিদার জাহ্নবী চৌধুরানী। একটি স্তম্ভর ওপর সূর্যের আলো ও ছায়া দৈর্ঘ্য নির্ণয় করে সময় নির্ধারণ করা হতো। স্তম্ভর পাশে ৪টি ঘর থাকে প্রতিটি ঘরে মাপ ১৫। সূর্যের আলোর ছায়ার দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ও ক্যালেন্ডারের সাহায্যে মূল রিডিং পরিমাপ করে ঘণ্টা নির্ধারণ করা হতো।
বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুথী আক্তার বলেন, আমাদের স্কুল একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুল। এই স্কুলে ১০১টি দরজা ও বাংলাদেশ দুটি সূর্যঘড়ি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি। সূর্যের আলো যখন এই ঘড়ির ওপর পড়ে আলো দেখেই বুঝতে পারি এখন কয়টা বাজে। তবে ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, এর মাঝেই পাঠদান চলে। দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক দুলাল রায় বলেন, আমরা সূর্যঘড়ি দিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করি। সূর্যের আলো ছায়ার ওপর ভিত্তি করে সময় নির্ণয় করা হয়। ১৮৭০ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই সূর্যঘড়ি চলমান রয়েছে। ব্রিটিশ আমলের ইংরেজি শিক্ষক পিসি সেন এই ঘড়িটি আবিষ্কার করেন। বিদ্যালয়টি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সরকার যদি এটির সংস্কারের উদ্যোগ নেয় তাহলে এর ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সুমিতা সূত্রধর জানান, ঐতিহ্যবাহী স্কুলটি বৃহত্তম ময়মনসিংহের দ্বিতীয় স্কুল। কিন্তু বর্তমানে স্কুল জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে এটা সংস্কার অতি জরুরি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চান মিয়া বলেন, বর্তমানে ভবনটি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ভবনের দেয়ালগুলো ফাটল ধরেছে সংস্কারের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন জানান তিনি।
টাঙ্গাইলে জমিদার আমলে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী সূর্যঘড়ি আজও সময়ে সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘণ্টা নির্ধারণ করে। শতবর্ষ পেরিয়েও নিখুঁত কারিগরী ও স্থাপত্যশৈলীর অন্যান্য নিদর্শন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক এই নিদর্শন সংরক্ষণে দ্রুত সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
