logo

চিকিৎসক ছাড়াই চলছে বয়রা বন্যপ্রাণী কেন্দ্র, ঝুঁকিতে ২১ জেলার প্রাণীসেবা

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
চিকিৎসক ছাড়াই চলছে বয়রা বন্যপ্রাণী কেন্দ্র, ঝুঁকিতে ২১ জেলার প্রাণীসেবা
ভেটেরিনারি চিকিৎসক ছাড়াই চলছে খুলনার বয়রা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার অন্যতম নির্ভরস্থল খুলনার বয়রা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। অথচ এক দশকের বেশি সময় ধরে কেন্দ্রটিতে নেই কোনো স্থায়ী ভেটেরিনারি চিকিৎসক। ফলে গুরুতর অসুস্থ বা আহত প্রাণীর চিকিৎসায় কখনো দূরের সাফারি পার্কের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হচ্ছে ভিডিও কলে, আবার কখনো বাইরে থেকে চিকিৎসক এনে দিতে হচ্ছে সেবা। এর সঙ্গে রয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, অস্ত্রোপচারের সুবিধা ও ওষুধের ঘাটতি।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘Strengthening Regional Cooperation for Wildlife Protection’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৫ সালে বয়রা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্প চলাকালে কেন্দ্রটিতে একজন ভেটেরিনারি চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করতেন। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তিনি বিসিএস প্রাণিসম্পদ ক্যাডারে যোগ দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর আর কেন্দ্রটিতে স্থায়ী কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে কেন্দ্রটিতে জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট, অ্যানিমেল কিপার ও ফরেস্ট গার্ডসহ ৭ থেকে ৮ জন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ছোটখাটো অসুস্থতা বা আঘাতের ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলেও গুরুতর আহত প্রাণীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সুযোগ তাদের নেই।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের স্মার্ট ডাটা কো-অর্ডিনেটর মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, বড় ধরনের কোনো প্রাণী উদ্ধার করে বয়রা কেন্দ্রে আনা হলে গাজীপুরের সাফারি পার্ক অথবা কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রাণীর শারীরিক অবস্থা দেখে তারা চিকিৎসার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, প্রাণীর অবস্থা গুরুতর হলে শুধু ভিডিও কলের মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয় না। তখন স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসকদের এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়। বন বিভাগের নিজস্ব বাজেট না থাকলেও এসব চিকিৎসকের সম্মানী দিতে হয়। অনেক সময় তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থাও করতে হয়।

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি ২১ জেলার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম চালাতেও জনবল ঘাটতিতে রয়েছে বন বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশাল এই এলাকার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজে রয়েছে মাত্র ৩০ জন কর্মী।

মো. মফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য আরও লজিস্টিক সাপোর্টের পাশাপাশি জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। খুলনা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী কিংবা ভোলার মতো দূরবর্তী এলাকায় বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সেখানে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, জনবল সংকট কিছুটা মোকাবিলায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠিত করে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের সংগঠিত করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে উদ্ধার ও সংরক্ষণের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একটি করে কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হলে বয়রা কেন্দ্রের স্টাফদের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব দিয়ে কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে আহত বন্যপ্রাণী উদ্ধার এবং এক স্থান থেকে অন্যস্থানে প্রাণী স্থানান্তরের কাজ দ্রুত করা যাবে।

নির্মল কুমার পাল বলেন, অন্য দপ্তরের কর্মীদের দিয়ে সবসময় আন্তরিকভাবে এই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার কারণে কাজ করতে হয়। নিজস্ব স্টাফ থাকলে কোনো এলাকায় আহত বন্যপ্রাণী পাওয়া গেলে দ্রুত তাদের নির্দেশনা দিয়ে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

বয়রা কেন্দ্রটিতে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর জন্য পৃথক বেষ্টনী রয়েছে। বাঘ, হরিণ, কুমির, স্মল ক্যাট ও পাখির জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা। স্মল ক্যাটের বেষ্টনীতে মেছো বিড়াল, চিতাবিড়াল ও গন্ধগোকুলের মতো প্রাণী রাখা হয়।

হরিণের বেষ্টনীতে বর্তমানে ২ থেকে ৩টি হরিণ রয়েছে। বিভিন্ন সময় লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া বা লাইসেন্স সমর্পণের পর জব্দ করা হরিণ এখানে রাখা হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা মিঠাপানির কুমিরও কুমিরের বেষ্টনীতে রাখা হয়।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে সুস্থ করে অবমুক্ত করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া প্রাণীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে কেন্দ্রটির বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার জন্য ভেটেরিনারি চিকিৎসক না থাকলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়ে প্রাণী মারা যেতে পারে। কেন্দ্রটিতে চিকিৎসকের পদ না থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী পদ সৃষ্টি করে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া উচিত। প্রাণিসম্পদ বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক রয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বন্যপ্রাণীর চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে শুধু উদ্ধার অভিযান ও আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। উদ্ধার করা প্রাণীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দক্ষ ভেটেরিনারি চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এক দশকের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আহত ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর জন্য কাজ করে আসছে বয়রা কেন্দ্রটি। কিন্তু স্থায়ী ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামো না থাকায় গুরুতর আহত প্রাণীর ক্ষেত্রে এখনো বাইরের চিকিৎসক ও দূরের সাফারি পার্কের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বন বিভাগকে।