দুই যুগেও সচল হয়নি ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল

২৩ বছর ধরে অবহেলা ও অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ২০০৩ সালে উদ্বোধন হওয়া ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি। শহরের যানজট কমানোসহ বাসযাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করতে ২০০৩ সালে নির্মাণ করা হয় ঠাকুরগাঁও জেলা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ঘটা করে উদ্বোধনও করা হয়। তবে ২৩ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত যাত্রীদের কোনো কাজেই আসছে না তৎকালীন দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ বাস টার্মিনালটি। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় এটি এখন প্রায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর পেছনে কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা।
ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে ৫ বিঘা জমির ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে বাস টার্মিনালটি নির্মিত হয়। তৎকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া এ টার্মিনালের উদ্বোধন করেছিলেন। তবে উদ্বোধনের পর এটি আর ব্যবহার করা হয়নি।
ব্যবহার না হওয়ায় পড়ে থেকে টার্মিনালটির অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে দরজা-জানালার লোহা। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। আর অরক্ষিত থাকার সুযোগে জায়গাটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
টার্মিনালটি সব সময়ই যাত্রীশূন্য থাকে। কারণ, পরিবহন কোম্পানিগুলোর বাস এখানে এসে থামে না। মহাসড়কের বিভিন্ন বিপজ্জনক স্থানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজটের।
সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়ন থেকে বাস টার্মিনালে আসা যাত্রী আসমা বেগম বলেন, “আমি দিনাজপুর মেয়ের বাসায় যাব। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি। টিকিট মাস্টার বললেন গাড়ি আসতে আরও ১০ মিনিট লাগবে। এদিকে আমার শৌচাগারে যাওয়া প্রয়োজন, কিন্তু টার্মিনালের কোনো শৌচাগারই ভালো নেই; দরজা-জানালা পর্যন্ত নেই। বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়ে পেট্রোল পাম্পের শৌচাগারে যেতে হচ্ছে। আমরা নারী যাত্রীরা কতটা ভোগান্তিতে পড়ি, তা বলে বোঝানো যাবে না। টার্মিনালের শৌচাগারগুলো দ্রুত সংস্কার করা দরকার, যাতে নারী যাত্রীরা শান্তিতে যাতায়াত করতে পারেন।
আরেক যাত্রী দিলরুবা বেগম বলেন, রংপুরে চিকিৎসক দেখাতে যাব। টার্মিনালে এসে ৪০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ি আসতে দেরি হবে, কিন্তু বসে অপেক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি আমরা নারী যাত্রীরা শৌচাগারে যাব, তারও সুযোগ নেই। এমন ভোগান্তি হবে জানা ছিল না। সরকারের কাছে অনুরোধ, দ্রুত টার্মিনালটি ঠিক করে যাত্রীদের ব্যবহারের উপযোগী করে দেওয়া হোক।
শান্ত নামের এক যাত্রী বলেন, আমি মাকে নিয়ে রংপুরে চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছি। রোগী মানুষ, যেকোনো সময় শৌচাগারে যেতে হতে পারে। কিন্তু বাস মালিকরা বিপুল পরিমাণ টাকা টোল হিসেবে তুললেও কেন এই টার্মিনালটি মেরামত করে পুনরায় চালু করছে না, তা বোধগম্য নয়। এটি চালুর মাধ্যমে সবার জন্য সুন্দর যাতায়াতের ব্যবস্থা করাই আমাদের একমাত্র দাবি।
নুসরাত নামে অন্য এক যাত্রী বলেন, দূরে কোথাও যেতে হলে খাবার কেনা, শৌচাগার ব্যবহার কিংবা নামাজ পড়ার জন্য এই টার্মিনাল থেকে অনেক দূরে যেতে হয়। অথচ টার্মিনালের ভেতরেই এসব ব্যবস্থা ছিল, যা এখন অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হচ্ছে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই বাস টার্মিনালটি পুনরায় চালু করার দাবি জানাচ্ছি।
রাস্তার ধারে চেয়ার পেতে টিকিট বিক্রি করছেন টিকিট মাস্টার আব্দুল জলিল। টার্মিনালের ভেতরে টিকিট কাউন্টার থাকা সত্ত্বেও বাইরে বিক্রি করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রীরা ভেতরে টিকিট কাটতে যেতে চান না, তারা রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরও রাস্তার পাশে টিকিট বিক্রি করতে হচ্ছে। তাছাড়া ভেতরের পরিবেশ একদমই ভালো নয়।
ঠাকুরগাঁও বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস হোসেন নম্র চৌধুরী বলেন, বাস টার্মিনালের আশপাশে বেশ কয়েকটি যাত্রীছাউনি রয়েছে এবং সেগুলোর প্রতিটিতে টিকিট কাউন্টার আছে। যাত্রীরা সেখান থেকেই টিকিট কেনেন। বাসগুলো যাত্রীছাউনির সামনে থেমে যাত্রী তোলে ও নামায়। ফলে টার্মিনালে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে না। তবে ইতোমধ্যে টার্মিনালটি চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি খুব শিগগিরই এটি চালু হবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার খায়রুল ইসলাম বলেন, দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৩ সালে টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু দুই যুগ ব্যবহার না হওয়ায় এটি ধ্বংসের মুখে পড়ে আছে। এটিকে সচল করতে আমরা ইতোমধ্যে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, যানজট কমানোসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্যেই পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের পর উদ্বোধন হলেও ব্যবহার না করায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দ্রুত এটি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।



