ফোন কেনার জন্য খুন করে লাশ গুম

শিশু সিয়াম আহম্মেদ মিঠু ও মোবাশ্বের হোসেন প্রতিবেশী। হঠাৎ একদিন মোবাশ্বের নিখোঁজ হয়ে যায়। পরিবার শুরু করে খোঁজাখুঁজি। সন্ধান না পেয়ে এলাকাজুড়ে করা হয় মাইকিং। মোবাশ্বেরকে খোঁজাখুঁজির পুরো সময়জুড়ে তার পরিবারের সঙ্গে ছিল সিয়াম। ছয় বছর পর জানা গেল–প্রতিবেশী সিয়ামের হাতেই খুন হয় মোবাশ্বের।
শিশু বয়সে গুম ও খুনের দায়ে সিয়ামকে (বর্তমানে প্রাপ্ত বয়স্ক) ১৭ বছর কারাভোগ করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় রোববার (২১ জুন) এই সাজা দিয়েছেন পঞ্চগড়ের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল। একই অপরাধে জরিমানা করা হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। জনিমানার টাকা দিতে না পারলে আরও নয় মাস কারাভোগ করতে হবে।
খুনের পর লাশ গুম
এজাহার ও অদালত সূত্রে জানা যায়, সিয়াম আহম্মেদ মিঠু ও মোবাশ্বের হোসেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার নায়েকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ২০২০ সালের ৮ মে পাঁচ বছর বয়সে নিখোঁজ হয় মোবাশ্বের।
পরে এলাকার একটি বেত বাগানে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায় মোবাশ্বেরের গলাকাটা মরদেহ। খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেওয়ায় হত্যার ঘটনায় সিয়ামকে সন্দেহ করেনি মোবাশ্বেরের পরিবার। তবে এলাকার কয়েকজন জানায় সর্বশেষ সিয়াম ও মোবাশ্বেরকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল।
এ তথ্যের ভিত্তিতে ওই বছরের ১০ মে সিয়ামের বিরুদ্ধে দেবীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন মোবাশ্বেরের বাবা আলম হোসেন। পুলিশের তদন্তেও উঠে আসে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য। তদন্ত চলাকালে সিয়াম ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেন হত্যার পর মরদেহ লুকিয়ে রাখার কথা।
তদন্ত শেষে দেবীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বজলুর রশীদ ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিচার চলাকালে ২০ জন সাক্ষী অংশ নেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ, সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং ভিকটিম ইমপ্যাক্ট বিবরণী পর্যালোচনা শেষে আদালত অভিযুক্তকে শিশু অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন।
অপরাধের সাজা
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় সিয়াম আহম্মেদ মিঠুর বয়স ছিল ১৪ বছর। বর্তমানে তার বয়স ২০ বছর। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অপরাধের সময় সিয়াম শিশু ছিলেন। অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় সিয়ামকে রাখা হয়েছিল শিশু (কিশোর/কিশোরী) উন্নয়ন কেন্দ্রে (শোধনাগার)।
প্রাপ্ত বয়স্ক (১৮ বছর) হওয়ার পর সিয়ামকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কারামুক্ত হয়ে জামিনে ছিলেন তিনি। রোববার রায় ঘোষণার দিন আদালতে আসেন তিনি। তার উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন বিচারক।
রায়ে আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৭ ধারায় শিশু অপহরণের দায়ে সাত বছর কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। টাকা অনাদায়ে তিন মাস কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার দায়ে ১০ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। টাকা অনাদায়ে ছয় মাস কারাভোগের আদেশ দেওয়া হয়। জরিমানার মোট ৭০ হাজার টাকা মোবাশ্বেরের পরিবার পাবে। জরিমানা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতের রায়ে প্রতিক্রিয়া
পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. খলিলুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল মোবাশ্বেরকে আটকে রেখে তার পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা। টাকা পেলে ফোন কেনার পরিকল্পনা ছিল। সার্বিক অবস্থা দেখে সিয়াম টাকা চাওয়ার সাহস পায়নি।
তিনি আরও বলেন, ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে মোবাশ্বেরকে হত্যার পরিকল্পনা করে সিয়াম। এজন্য এক প্রতিবেশীর কাছে বেত গাছ কাটার কথা বলে একটি দা নিয়ে যায়। সেই দা দিয়ে মোবাশ্বেরকে হত্যা করে সিয়াম। আদালতে সিয়াম ও সাক্ষীরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ রায়। আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট। এ রায়ে আদালত একটি নজির স্থাপন করেছেন।
মোবাশ্বেরের বাবা আলম হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার ছেলেকে যে হত্যা করেছে, সে আমাদের প্রতিবেশী ছিল। ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে আমরা যখন দিশেহারা, তখন সেও আমাদের সঙ্গে খোঁজাখুঁজি করেছে, মাইকিং করেছে। কখনও ভাবিনি সে আমার সন্তান হত্যার ঘাতক।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ছয় বছর পর আদালতের রায়ে আমরা কিছুটা হলেও ন্যায়বিচার পেয়েছি। আর কোন বাবা-মা যেন তাদের সন্তানকে এভাবে না হারায়। আসামির সাজা যেন কার্যকর হয়। কোনোভাবে যেন সে আইনের ফাঁকে বের হতে না পারে।







