ঝিনাইদহের অধিকাংশ নদী কচুরিপানার দখলে

একসময়ের খরস্রোতা নদীগুলো ছিল ঝিনাইদহের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নৌ-যোগাযোগের অন্যতম ভরসা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে জেলার অধিকাংশ নদী এখন কচুরিপানার দখলে চলে গেছে। কোথাও কোথাও এত ঘন কচুরিপানা জমেছে যে নদীর পানিও দেখা যায় না। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কমছে নদীর নাব্যতা, হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য এবং বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা।
জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা, কুমার, চিত্রা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেগবতী, কালীগঙ্গা, কোদলা, গড়াই ও বেতনা নদীর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে কচুরিপানার ব্যাপক বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ সদর, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার নদী ও শাখা-খালগুলোতে কচুরিপানার ঘন স্তর পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। দীর্ঘদিন ধরে নদী পরিষ্কার, খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় অনেক নদী ধীরে ধীরে নাব্যতা হারাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা নদীতে আটকে মাসের পর মাস জমে থাকে। নিয়মিত অপসারণ না হওয়ায় কচুরিপানার নিচে পলি জমে নদীর গভীরতা কমছে। অনেক স্থানে নৌকা চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার তৈলকুপী গ্রামের বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, আগে সারা বছর নদীতে ডোঙ্গা (তালগাছের তৈরি নৌকা) চলত। এখন কচুরিপানায় নদী এমনভাবে ঢেকে থাকে যে অনেক সময় পানিই দেখা যায় না। বর্ষা এলে পানি নামতে দেরি হয়, আশপাশের জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
শৈলকুপার কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, নদী ও খালে কচুরিপানা জমে থাকায় সেচের পানি চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। অনেক খাল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কৃষিকাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

মৎস্যজীবীদের দাবি, নদীতে কচুরিপানার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় মাছের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। ভৈরব নদীতে মাছ ধরা অবস্থায় কথা হয় আব্দুস সামাদ নামে এক জেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে যে নদীতে জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাছ অনেক কমে গেছে। কচুরিপানার কারণে জাল ফেলতে কষ্ট হয়, অনেক সময় জাল ছিঁড়েও যায়। দ্রুত কচুরিপানা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী এবং ‘সোনার বাংলা ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক শিবুপদ বিশ্বাস বলেন, কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছাতে পারে না। ফলে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় এবং মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হয়।
তিনি আরও বলেন, কচুরিপানার কারণে নদীর পানি স্থির হয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। নদী ও খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে পানি দ্রুত নামতে পারে না।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রঞ্জন কুমার দাস বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নদীতে পলি জমা এবং উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য আমাদের কোনো বাজেট আসে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় স্থানে খনন ও নদী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। কচুরিপানা পরিষ্কারের মূল দায়িত্ব স্ব-স্ব উপজেলার মৎস্য অধিদপ্তরের। কারণ পানির ওপর কচুরিপানায় পরিপূর্ণ থাকলে মাছের ক্ষতি হয়।
ঝিনাইদহ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুন্তাসির রহমান বলেন, কচুরিপানা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্তার লাভ করলে তা নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে। কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছাতে পারে না, দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কচুরিপানা পচে পানিদূষণ ও দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আমরা মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং নদী রক্ষা কমিটির সহযোগী হিসেবে কাজ করি। আর এ বিষয়ে আমাদের সরকারি কোনো সরাসরি নির্দেশনা নেই। নদী রক্ষা কমিটির সভায় আমি বিষয়টি সভায় উত্থাপন করব।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শিল বলেন, ঝিনাইদহে মোট ১৩টি নদী আছে, প্রায় প্রতিটি নদীই কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। এটা একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ, কিন্তু এর জন্য সরকার থেকে কোনো অতিরিক্ত বরাদ্দ আসে না। তাহলে আমরা কীভাবে এটা নিরসন করব? আমাদের নির্ধারিত যে বরাদ্দ আছে তার বাইরে আর কোনো বরাদ্দ পাই না। কচুরিপানার কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী মারা যায়। কারণ সূর্যের আলো পানির নিচে না পৌঁছালে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে না। এটার দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজর দেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কচুরিপানা অপসারণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছরই নতুন করে কচুরিপানা নদী দখল করবে এবং জেলার অনেক নদী ক্রমেই মৃতপ্রায় হয়ে পড়বে।
.png)






